প্রাচীন রোমের ১০ টি নৃশংস অত্যাচার

প্রাচীন রোমের নির্যাতনগুলোর নৃশংসতা এতটাই লাগামছাড়া ছিলো যে, হাজার বছর পর আজও সেসব নৃশংস ঘটনার কাহিনী পড়তে গেলে আপনার বুকের ভেতরটা সামান্য হলেও কেঁপে উঠবে। আজ আপনার সামনে থাকছে প্রাচীন রোমের ১০ নৃশংস অত্যাচারের গল্প।

১.ব্যারেলে নির্যাতন

৮১ থেকে ৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রোমের সম্রাট ছিলেন ডোমিশিয়ান। এ সাম্রাজ্যের একাদশ সম্রাট ছিলেন তিনি। তার শাসনামলে সেখানে বসবাসকারী খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেদের উপর নেমে এসেছিলো ভয়াবহ সব নির্যাতন।

নানা ধরনের নির্যাতনের মাঝে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিলো ব্যারেল সম্পর্কিত নির্যাতনটি। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির পুরো দেহ প্রথমে মধু ও দুধ দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে দেয়া হতো। এরপর তাকে একটি ব্যারেলে আটকে রাখা হতো, খেতে দেয়া হতো পচে পোকা ওঠা সব খাবারদাবার। সেসব খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তো লোকটি। আনুমানিক দু’সপ্তাহ পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো সেই দুর্ভাগা।

Image Credit: History ten

২. জীবন্ত কবর

সম্রাট নিরো সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেতেন মানুষকে জীবন্ত কবর দিয়ে। এ আনন্দ আরো বেশি হয়ে ধরা দিতো, যখন তিনি কোনো ভেস্টাল ভার্জিনকে তাদের সতীত্ব সংক্রান্ত শপথভঙ্গের জন্য এ শাস্তি দিতেন। একবার তিনি এমন শাস্তি দিয়েছিলেন যাজিকা রুব্রিয়াকে। তাকে একটি ছোট গুহায় আটক করে রেখে আসা হয়েছিলো কোনো রকম দানাপানি ছাড়াই। সেখানেই কিছুদিন পর না খেতে পেয়ে মারা যান তিনি।

আরেক ক্ষেত্রে অপরাধীকে প্রথমে নিজের কবর নিজেকেই খনন করতে হতো। এরপর সেই কবরে রাখা হতো সূক্ষ্ম প্রান্তযুক্ত একটি লাঠি। লোকটিকে হাত-পা বেঁধে এরপর কবরে ফেলা হতো। যদি তার অপরাধের মাত্রা কম হতো, তাহলে এমনভাবে নিক্ষেপ করা হতো, যেন লাঠির চোখা অংশটি সরাসরি তার হৃদপিণ্ড ভেদ করে চলে যায়, অর্থাৎ তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়। আর যদি কারো অপরাধের মাত্রা কম হতো, তাহলে এমনভাবে নিক্ষেপ করা হতো, যেন সে মারাত্মক রকমের আহত হয়। এরপর তাকে সেখানেই ফেলে আসা হতো, কিংবা দেয়া হতো জীবন্ত কবর।

Image Credit: Wikipedia

৩. ক্রুশবিদ্ধকরণ

প্রাচীন রোমের অত্যন্ত জনপ্রিয় এক শাস্তিদান প্রথা ছিলো ক্রুশে বিদ্ধ করে একজন অপরাধীকে মেরে ফেলা। তবে সবসময় যে তাকে হাতে-পায়ে পেরেক আটকিয়ে মারা হতো, তা কিন্তু না। বরং একেক জল্লাদ একেক পদ্ধতি অবলম্বন করতো। এখানে যেন তারা প্রতিযোগিতা দিয়ে একে অপরের চেয়ে বেশি সৃজনশীলতা দেখাতে চাইতেন।

কখনো কখনো অপরাধীকে উলঙ্গ করে মাথা ঢেকে দেয়া হতো। এরপর উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো হতো, যতক্ষণ না তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাচ্ছে। কখনো আবার প্রথাগতভাবে হাত-পায়ে পেরেক মেরে আটকে রাখা হতো যতক্ষণ না সেই মানুষটি মারা যাচ্ছে। মৃত্যু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে মাঝে মাঝে আরো পেটানো হতো তাকে। কখনো লোকটিকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখে দেয়া হতো, কখনো আঘাত করা হতো জননাঙ্গে।

Image Credit: Ancient Rome. Info

৪. মৌমাছির আক্রমণ

এ নির্যাতনেও ব্যবহার করা হয়েছে প্রাণীকে। দোষী ব্যক্তিকে উলঙ্গ করে ঢোকানো হতো বড়সড়, ফাঁকা ফাঁকা করে বোনা বিশেষ একধরনের ঝুড়িতে। সেই ঝুড়ি পরবর্তীতে ঝুলিয়ে দেয়া হতো বড় কোনো গাছের শাখায়, যার আশেপাশে থাকতো বড় কোনো মৌচাক। মৌমাছিরা তখন ঝাঁপিয়ে পড়তো লোকটির উপর। হুলের যন্ত্রণায় একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো সেই অপরাধী।

Image credit: Pintarest

৫. কলড্রন টর্চার

এ নির্যাতনের পদ্ধতিটি বেশ ভয়াবহ। এজন্য প্রথমে কোনো ক্ষুধার্ত ইঁদুর, কুকুর কিংবা বেড়ালকে ছোট কলড্রনে আটকে রাখা হতো। এরপর কলড্রনের খোলা প্রান্তটি অপরাধীর পেটের দিকে মুখ করে আটকে দেয়া হতো।

এবার শাস্তিদানে নিয়োজিত ব্যক্তি এসে কলড্রনের পেছনে আগুনের উত্তাপ দিতেন। ক্ষুধার্ত প্রাণীটি তখন জীবন বাঁচাতে সামনের দিকে ছুট লাগাতো। সামনে থাকা বন্দীর পেটের মতো নরম মাংস পেয়ে সে সেটা খেয়েই তার ভেতর দিয়ে পালাতে চাইতো!

চিন্তা করে দেখুন তো একবার অবস্থাটি- জীবিত অবস্থায় কেউ যখন টের পায় তার নাড়িভুঁড়ি খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে কোনো প্রাণী, তখন তার অবস্থা কেমন হতে পারে?

আরো পড়ুন   সেপ্পুকু বা হারাকিরি: জাপানি সংস্কৃতিতে অনুমোদিত আত্মহত্যা
Image Source: HBO via the New Statesman

৬. সিনেটরের দুর্ভাগ্য

নৃশংসতার দিক থেকে টাইবেরিয়াসের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেন না সম্রাট ক্যালিগুলা। ৩৭ থেকে ৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্যের ৩য় সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

একবার এক সিনেটরের উপর মারাত্মক ক্ষেপে যান সম্রাট। শাস্তি হিসেবে লোকটিকে চিরে ফেলা হয়। তখনও তার প্রাণপাখিটি দেহরুপ খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যায় নি। এজন্য সম্রাট তখন নির্দেশ দিলেন লোকটির চোখ দুটো তুলে নিতে। এরপর গরম সাঁড়াশির সাহায্যে তার দেহের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো একে একে টেনে বের করা হতে থাকে! সবশেষে দেহটি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে দেয়া হয়!

রোমের মানুষজন বিশ্বাস করতো, মৃত্যু আসলে কোনো যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি নয়, বরং এর মধ্য দিয়েই আসে মুক্তি। যন্ত্রণার অনুভূতি হয় নির্যাতনের সময়। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নির্যাতিত লোকটি এ ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেত বলেই মনে করতো তারা।

Image Source: listverse.com

৭. মানুষকে তরবারি দিয়ে কুঁচিকুঁচি করে ফেলতো

প্রাচীনকালের রোমে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো সামাজিক অবস্থান। বিত্ত-বৈভব ও ক্ষমতার দিক দিয়ে যার অবস্থান যত উপরে, তিনি তত বেশি জবাবদিহিতার উর্ধ্বে থাকতেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, সম্রাটকে তার কাজের জন্য কারো কাছেই জবাবদিহিতা করতে হতো না। সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল তার বাহিনীর অন্যান্য অধস্তন কর্মকর্তা ও সাধারণ জনগণের উপর ক্ষমতাবান ছিলেন। ওদিকে একজন সাধারণ সৈনিকের ক্ষমতা বিস্তৃত ছিলো কেবল সাধারণ জনগণের উপর, সে তাদের নিকট কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকতো না।

সামাজিক মর্যাদার এই যে স্তরবিন্যাস, এটা কঠোরভাবে মেনে চলতে হতো। যদি একজন সাধারণ নাগরিক একজন সৈনিককে টপকে যেতে চাইতো, তাহলে তাকে জনতার সামনে খোজা করে ছেড়ে দেয়া হতো। আর একজন সৈনিক যদি এটা স্বেচ্ছায় মেনে নিত, তাহলে জনতার সামনে পেট কেটে তার নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলা হতো।

Image credit: Brewminate

৮. যৌনাঙ্গ বেঁধে ফেলা

রোমের ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণিত সম্রাট ছিলেন টাইবেরিয়াস। জনগণ সবসময় তার ভয়ে তটস্থ থাকতো। এর পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিলো তার তিরিক্ষি মেজাজ। মানুষকে শাস্তি দিতে সবসময় নানা রকম আজগুবি চিন্তা-ভাবনা, নিত্যনতুন উপায় ঘুরঘুর করতো তার মাথায়।

একবার এক বলিদানের অনুষ্ঠানে সেবাদানরত ভৃত্যকে মনে ধরে যায় টাইবেরিয়াসের, খায়েস জাগে তার সাথে সমকামে লিপ্ত হবার! অবশেষে ক্ষমতাবলে শুধু ভৃত্যকেই না, সেই সাথে তার ভাই, যে কিনা অনুষ্ঠানে বাঁশি বাজিয়েছিলো, তাকেও ধরে আনান সম্রাট। মনের অসুস্থ কামনা চরিতার্থ করার পর এ নিয়ে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল দুই ভাই। এতে ক্ষেপে গিয়ে তাদের পা ভেঙে দেন টাইবেরিয়াস।

যদি কাউকে শত্রু বলে মনে হতো, তাহলে ছলনা করে তাকে নিজের সাথে মদ্যপানের আমন্ত্রণ জানাতেন টাইবেরিয়াস। অতিরিক্ত মদ্যপানে লোকটি মাতাল হয়ে গেলে শুরু হতো সম্রাটের খেলা। ধারণাকৃত শত্রুর জননাঙ্গ বেঁধে ফেলতেন তিনি। এরপর শুরু হতো নির্যাতন। ভরপেটে এমন নির্যাতনের মুখে মারাত্মক প্রস্রাবের বেগ চাপলেও কিছুই করার থাকতো না সেই দুর্ভাগার!

আরো পড়ুন   কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জামাই দুর্ভোগ
Image source: Ancient Origin

৯. গাধার ভেতর ঢুকিয়ে রাখা

দৈনন্দিন জীবনে সামনাসামনি গাধা নামক প্রাণীকে আমরা যত কমই দেখি না কেন, কাউকে কোনো প্রাণীর নামে সম্বোধনে সম্ভবত গাধাই সবচেয়ে উপরে অবস্থান করছে। অমানুষিক পরিশ্রম বোঝাতে আমরা বলি ‘গাধার মতো খাটুনি’, আবার কারো স্থূলবুদ্ধি বোঝাতে বলে থাকি ‘গাধার মতো কথাবার্তা/বুদ্ধি’ টাইপের কথাগুলো।

আজকের দিনে গাধাকে নিয়ে আমরা যতই রসিকতা করি না কেন, প্রাচীন রোমানদের কাছে কিন্তু গাধা ছিলো এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম! নিরীহ এ প্রাণীকে ভয়ের আসলে কিছু ছিলো না। ভয় ছিলো এক শাস্তির সাথে এই প্রাণীর সংশ্লিষ্টতার জন্যই। অ্যাপুলিয়াস (ল্যাটিন ভাষায় গদ্য রচয়িতা, প্লেটোনীয় দার্শনিক এবং বক্তা) ও লুসিয়ানের (গ্রীক ব্যঙ্গসাহিত্য রচয়িতা এবং বক্তা) সাহিত্যকর্ম থেকে এর প্রমাণ মেলে।

এ উদ্দেশ্যে প্রথমে একটি গাধাকে মারা হতো। এরপর এর পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করা হতো। এবার অপরাধীর পরনের জামা-কাপড় খুলে হাত-পা বেঁধে তাকে গাধার ভেতর ঢোকানো হতো, সেলাই করে দেয়া হতো গাধার পেট, শুধু বাইরে রাখা হতো মানুষটির মাথা। এটা তো ছিলো নির্যাতনের কেবলমাত্র শুরুর কথা। আসল কষ্ট তো এখনও শুরুই হয় নি।

এবার গাধার মৃতদেহ কিংবা গাধার ভেতরে লোকটিকে, যা-ই বলা হোক না কেন, রেখে দেয়া হতো উত্তপ্ত রৌদ্রের নিচে। সূর্যের তাপে আস্তে আস্তে মৃতদেহে পচন ধরতে শুরু করতো। ওদিকে ভেতরে থাকা মানুষটির তখন গরমে জান যায় যায় অবস্থা। পচা অংশে জন্ম নেয়া পোকামাকড় উঠতে শুরু করতো লোকটির শরীরেও, আকাশ থেকে নেমে আসা শকুনের দল ঠোকরাতে শুরু করতো তার শরীরে। এভাবে বেশ কিছুদিন অমানবিক কষ্ট ভোগের পর অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তো সেই অপরাধী।

Image source: Roman History

১০. মানুষ হতো বুনো শূকরের খাবার

হেলিওপোলিস যখন রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো, তখনকার সময়ের একটি নির্যাতনের কথা বর্ণনা করেছেন সেইন্ট গ্রেগরি।

যদি কোনো কিশোরী কিংবা তরুণী কোনো বড় ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত হতো, তাহলে প্রথমে সবার সামনে তার পরনের জামা-কাপড় খুলে নেয়া হতো। এর পরপরই মেয়েটির পেট চিরে ফেলা হতো। মেয়েটি যখন যন্ত্রণায় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করতে থাকতো, তখন শাস্তি প্রদানকারীরা ব্যস্ত থাকতো তার পেটের কাটা অংশটি যব দিয়ে ভরতে। ভরা হয়ে গেলে আবার পেট সেলাই করে দেয়া হতো। এত অত্যাচারের পর মেয়েটিকে ছেড়ে দেয়া হতো বুনো শূকরের সামনে। প্রাণীটি এরপর মেয়েটিকে টুকরো টুকরো করে ফেলতো।

এমন শাস্তির শিকার হয়েছিলেন সেইন্ট অ্যাগনেস, সেইন্ট প্রিস্কা ও সেইন্ট ইউফেমিয়া অফ অ্যাকুইলেইয়া। এখানে আরেকটা কথা আছে, সম্ভবত এটাই এ নির্যাতনের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শাস্তির মুখোমুখি মেয়েটি হতো কুমারী। ওদিকে রোমান আইনে কুমারীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিলো না। এজন্য প্রথমে মেয়েটিকে তুলে দেয়া হতো একজন গ্ল্যাডিয়েটরের হাতে। সেই গ্ল্যাডিয়েটর মেয়েটিকে ধর্ষণ করার পরই তার উপর দিয়ে পরবর্তী ঝড়গুলো যেত।

Image Credit: Lamps Quarelty

Leave a Comment