এলেন স্যাডলার ঘুমিয়েছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর!

১৯ শতক ইতিহাসের অন্যান্য শতাব্দীর থেকে আলাদা। এই শতাব্দীর অনেক আবিষ্কার পৃথিবীর চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। শিল্প বিপ্লব চিকিৎসা থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থা সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান এই শতাব্দীর।

এই সময়টায় অনেক কিছু আবিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে মানুষজনকে নতুন অনেক জিনিসের সামনাসামনি হতে হয়েছিল। যা সম্পর্কে পূর্বে মানুষের কোনো ধারণা ছিলো না।
এলেন স্যাডলারের ঘটনা তেমনি একটি ঘটনা। মেয়েটি দীর্ঘ ৯ বছর ঘুমিয়ে ছিলো। এই ঘটনা নিয়ে তখন পুরো বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল কারণ তারা বুঝতে পারছিল না কী ঘটছে। এখন আমরা তা জানি সেটি ছিল নারকোলেপ্সি বা ঘুমের অসুস্থতার প্রথম জনপ্রিয় ঘটনা।

এলেন স্যাডলার ১৮৫৯ সালের ১৫ মে তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ১২ জন। বাবা মায়ের ১০ম সন্তান ছিলেন। এলেন স্যাডলার।

তার পরিবার ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড এবং বাকিংহামশায়ারের মধ্যে অবস্থিত টারভাইল নামে একটি ছোট্ট গ্রামে বসবাস করতো। এজন্য এলেন স্যাডলার বিশ্বব্যাপী পরিচিত “The sleeping girl of Turville” নামে।

এলেন স্যাডলারের তার বাবা উইলিয়াম স্যাডলার একজন কৃষক ছিলেন কিন্তু তিনি একটি দুর্ঘটনায় অল্প বয়সে মারা যান। তার মা অ্যান স্যান্ডলার ‘থমাস ফ্রুয়েন’ নামে এক পুরুষ কে বিয়ে করে। থমাস একজন কারখানার কর্মীছিলেন। তিনি তার সৎ সন্তানদেরকে তার নিজের সন্তানের মতোই দেখভাল করতেন।

গভীর ঘুম
১৮৭১ সালে এলেন স্যাডলারের বয়স তখন ১১ বছর। জন্মের পর তার কোনো প্রকার শারিরীক বা মানসিক সমস্যা দেখা যায় নি। ২৯ মার্চ ১৮৭১ সালে সে তার অন্যান্য ভাইবোনদের সাথে প্রতি রাতের মতোই ঘুমাতে গিয়েছিল, একমাত্র পার্থক্য ছিল পরের দিন সকালে সে ঘুম থেকে ওঠেনি। চেঁচামেচি, ঝাঁকুনি বা ধাক্কা দেওয়া সত্ত্বেও সে জেগে উঠে নি।

প্রথমে, সবাই ভেবেছিল যে সে মারা গেছে কিন্তু তার তখনও নাড়ি ছিল এবং তার শরীরও উষ্ণ ছিল। স্থানীয় চিকিৎসকরা তার অবস্থা বিশ্লেষণ করেছেন কিন্তু কেউ এর আগে এমন কিছু দেখেনি। এই গভীর শীতনিদ্রা অবস্থার কারণ কী তা তারা বলতে পারছিলেন না।

এলেন স্যাডলার এর গভীর ঘুমে যাওয়ার আগে তোলা ছবি।

সারা দেশ থেকে বিশেষজ্ঞরা এলেনকে দেখতে এসেছেন কিন্তু তাদের কেউই এমন কিছু দেখেননি বা শুনেননি।
এলেন স্যাডলারকে দেখতে মানুষজন তার পরিবার কে অর্থ দান ও করতে। এসব পরিদর্শন করা লোকেদের মধ্যে কেউ কেউ তাকে জাগানোর চেষ্টা করার জন্য জোর দিয়েছিল। প্রত্যেকে বিভিন্ন ধরণের অ্যালার্ম, উদ্ভাবন এবং কৌশল নিয়ে এসেছিল কিন্তু তাদের কোনটিই কাজ করেনি।

টাইমস সেই বছরের পরে এলেন স্যাডলারের এই ঘটনা সম্পর্কে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল যেখানে তারা বলেছিলঃ-

আরো পড়ুন   ডগ'স সুইসাইড ব্রিজ: যে ব্রিজ থেকে কুকুর'রা আত্মহত্যা করে

সবচেয়ে অবিশ্বাস্য, অবর্ণনীয় শারীরবৃত্তীয় ঘটনা যার সম্মুখীন হয়নি কেউ কখনো।
(দ্য টাইমস ১৮৭১)

এটিই এলেনকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল, এমনকি বিদেশ থেকে আসা লোকজনকেও ঘুমন্ত এই মেয়েকে দেখার জন্য আকৃষ্ট করেছে।

অর্থদান করার পাশাপাশি কিছু লোকজন এলেন স্যাডলারের চুলের কিছু অংশ কেটে নেয়ার বিনিময়ে তার পরিবার কে বড় অঙ্কের অর্থের প্রস্তাব দিতো। যেহেতু পরিবারটি বড় ছিল এবং আয় খুবই খারাপ ছিল, তাই তারা কিছু অনুরোধ গ্রহণ করেছিল যার ফলে তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছিল।

স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করে, এই ভেবে যে তার পরিবার মেয়েটির অসুস্থতা নিয়ে ব্যবসা করছে। তার পরিবার পুলিশের উল্লেখ করেছে যে তারা টাকা চায়নি, লোকেরা তাদের স্বাধীন ইচ্ছায় দান করেছে, এবং প্রত্যেককেই ফি না দিয়েই এলেনকে দেখতে দেওয়া হয়েছিল।

মানুষজন ভাবছিল কয়েক মাস কিছু না খেয়েও মেয়েটি কীভাবে বেঁচে আছে?
তার মা একটি ছোট চায়ের পাত্রে চিনি দিয়ে তাকে দোল, দুধ এবং ওয়াইন খাওয়াচ্ছিলেন। এক বছর পর মেয়েটির চোয়াল বন্ধ হয়ে যায় এবং তখনই তার মা তাকে একটি ছোট ফাঁক দিয়ে খাওয়াতে শুরু করেন।

দুঃখজনকভাবে ১৮৮০ সালে, তার মা অ্যান একটি অপ্রত্যাশিত হার্ট অ্যাটাক এর কারনে মারা যান।
চিকিৎসকরা যা বলেছিলেন তার উপর ভিত্তি করে, অ্যান আশা ছেড়ে দেওয়ার কারণে যে ক্রমাগত চাপ এবং মানসিক সমস্যা হয়েছিল যে এলেন কখনও জেগে উঠবে যা খুব বেশি উদ্বেগকে উস্কে দেয়,আর তাই তার হার্ট অ্যাটাক হয়।

দীর্ঘ ঘুমের অবসান

মায়ের মৃত্যুর মাত্র ৫ মাস পরে, এলেন দীর্ঘ ৯ বছর পর জেগে ওঠেন। তিনি ১১ বছর বয়সে ঘুমাতে গিয়েছিলেন এবং তিনি ২০ বছর বয়সে জেগেছিলেন। মজার ব্যাপার যে তিনি আসলে ১৮৮০ সালে নববর্ষের প্রাক্কালে জেগে উঠেছিলেন। পরের দিন (১৮৮১ সালের ১ জানুয়ারী) সংবাদপত্রগুলি এই ঘটনা নিয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল, সারা বিশ্ব জানলো যে টারভাইলের ঘুমন্ত মেয়েটি জেগে উঠল, যদিও সবাই আশা ছেড়ে দিয়েছিল সে কখনোই জাগবে না।

যখন এলেন স্যাডলার জেগে ওঠে তখন সে তার ভাইবোনদের দ্বারা বেষ্টিত ছিল এবং দুঃখজনক সংবাদটি দেয় যে তার বাবা-মা উভয়ই মারা গেছে।
এলেন স্যাডলার দাবি করছিলেন তিনি স্বপ্ন দেখেন নি এই দীর্ঘ সময়ে।

একবার ভাবুন তো যদি আপনি ১১ বছর বয়সে ঘুমিয়ে ২০ বছর বয়সে জেগে উঠেছেন আর মাঝে হারিয়ে ফেলেছেন আপনার শৈশব আপনার অজান্তেই।

এলেন স্যাডলার যেহেতু ঘুমের মধ্যে ছিলেন তার বয়স বাড়লেও তার মানসিক অবস্থা ছিল ১১ বছরের কিশোরীর মতোই। কারণ জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার কোনো শিক্ষা বা সাধারণ জ্ঞান অর্জনের সুযোগ ছিল না। তাকে ধীরে ধীরে নিতে হয়েছিল এবং তার খালা গ্রেস ব্ল্যাকঅলের সাহায্যে তিনি সহকে এই সমস্যা কাটিয়ে উঠেছিলেন।

আরো পড়ুন   নাম না জানা এক ভাষা শহীদের রক্তমাখা চিঠি

তার ঘুমের সময় উপার্জিত অর্থের বেশিরভাগই ব্যয় করা হয়েছিল পরিবার ও তার পেছনেই। আর তাই এলেন স্যাডলার কে জীবিকার জন্য নতুন পথ বেছে নিতে হয়েছিল। আর তাই তিনি পুতির মালা তৈরি করতেন এবং বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতেন।

ঘুম থেকে জেগে উঠার কয়েক বছর পরে তিনি একজন কৃষকের সাথে বিয়ে করেন এবং ছয়টি সন্তানের জন্ম দেন।

দুঃখজনকভাবে ১৯০১ সালে, এলেন কোনো প্রকার শারিরীক অসুস্থতা ছাড়াই মারা যান এবং তার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তিনি কী ছিলেন তার কোনো রেকর্ডও নেই।

চিকিৎসা
১৮৮০ সালে এলেন জেগে ওঠার পর ডঃ গেলিনুয়া এলেনকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। হঠাৎ কি কারণে তার দীর্ঘ ঘুম ভেঙে গেল?

১৮৮০ সালে প্রথমবারের মতো চিকিৎসকরা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ঘুমের কারণের অসুস্থতার ধরন রয়েছে। আমরা আজকে চিকিৎসকদের দ্বারা এটি বর্ণনা করার জন্য যে শব্দটি ব্যবহার করি তা হল নারকোলেপসি।

এই বিরল মস্তিষ্কের অবস্থার কারণে একজন ব্যক্তি দীর্ঘ সময়ের জন্য হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে। এটি ব্যক্তিকে ঘুমের পক্ষাঘাতের দিকে নিয়ে যায় যার অর্থ তারা জাগ্রত হতে পারে না। নারকোলেপসি অরেক্সিনের অভাবের কারণে ঘটে যা একটি মস্তিষ্কের রাসায়নিক হাইপোক্রেটিন যা আমাদের ঘুম থেকে জেগে উঠতে এবং দিনের বেলা জেগে থাকতে সাহায্য করে।

যদিও নারকোলেপসি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করে না, তবে এটি তাদের জন্য গুরুতর মানসিক সমস্যার কারণ ছিল যারা তাদের জীবনের একটি বড় অংশ হারান যখন বছরের পর বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকেন ঠিক এলেন স্যান্ডলারের ক্ষেত্রে।
এটি এমনও হতে পারে যে এলেনের শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াই মৃত্যু তার যৌবনের এত বছর হারানোর বিষণ্নতার কারণে হয়েছিল।

এমনকি আজ অবধি, নারকোলেপসিতে আক্রান্ত রোগীদের ঠিক কেমন করে হঠাৎ জেগে উঠেন তার কারণ এখনও অজানা, এর জন্য কোনও চিকিৎসাও নেই।

তথ্যাসূত্র:- এই আরর্টকেলের বেশিরভাগ তথ্য রোনাল্ড কোহন জেসি রাসেলের লেখা ‘দ্য স্লিপিং গার্ল অফ টারভাইল’ বই থেকে নেওয়া হয়েছে।

Featured Image credit: Bernhard Keil  (1624–1687)

Leave a Comment