প্রাচীন রোমের শাসনব্যবস্থা

প্রাচীন রোমের শাসনব্যবস্থা সিনেটের মাধ্যমে চালানো হতো। সিনেট হলো শহরের ধনী আর বিখ্যাত পরিবারের কিছু সদস্য নিয়ে গঠিত একটি দল। রোম যখন ছোট একটি শহর ছিল তখন এই সিনেট পদ্ধতি বেশ সফলভাবে কাজ করত। কিন্তু এবারে হাজার মাইল বিস্তৃত রাজ্যের পরিচালনায় সিনেট খুব সহজেই ব্যর্থ ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত হলো। সিনেটের সদস্য, যারা বেশির ভাগই ছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত, দেশের বিভিন্ন স্থানে যারা অর্থ আত্মসাৎ করছিলেন তারা নতুন সময়ের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি।

সরকার ব্যবস্থা আর সামাজিক পরিবর্তনগুলো নিজেদের এলাকায় কার্যকর করতে অপারগ ছিলেন বলে তাদের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে লাগল। সিনেটের সদস্যদের সমর্থনকারী দলের লোকেরা, যারা ক্ষমতা আর লুটপাটে ভাগ বসাতে চাচ্ছিলেন, প্রায় একশ ‘ বছর ধরে তাদের বিরোধীদলও সক্রিয় ছিল। ( অবশ্য দুই দলেই আদর্শবান কিছু লোক ছিল যারা সৎ ও দক্ষ একটি সরকার প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় দিন গুনত। ) দুই দলই বলপ্রয়োগ করাতে প্রায় অর্ধশতাব্দীর জন্য যুদ্ধ বেঁধে গেল।

জুলিয়াস সিজার

জুলিয়াস সিজার সিনেটের আইনে কিছু পরিবর্তন এনে এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কেবল ইতালিতে জন্মালে আর বেড়ে উঠলেই একজন মানুষ সিনেটের সদস্য হতে পারবে, এই বাধ্যবাধকতা তিনি উঠিয়ে দিলেন। দেশের বিভিন্ন বিভাগ থেকে সদস্য নির্বাচন করে তিনি নতুন সিনেট গড়তে আরম্ভ করলেন। এভাবে বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক নির্বাচন হয়তো দেশের সব সেনাপ্রধানের মনরক্ষার জন্য ভালোই ফল এনেছিল।

কোনো সন্দেহ নেই, তিনি ভেবেছিলেন যে ইতালির বাইরে থেকে আসা সিনেট সদস্যদের মাথার ওপরে প্রধান হয়ে থাকাটা তার জন্য খুব সহজ হবে। ইতালিতে জন্মানো সদস্যদের রাজার প্রতি অনীহা থাকলেও, অন্য বিভাগ থেকে আসা মানুষদের জন্য জুলিয়াস সিজারই ছিলেন তাদের সর্বাধিনায়ক বা রাজা। এভাবেই রোমে একনায়কতন্ত্রের সংস্কৃতি চালু হলো।

সম্রাট জুলিয়াস সিজার

একজন মানুষ , যিনি কিনা তার দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন যে রোমকে নিয়মকানুনে বেঁধে আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব , নিঃসন্দেহে জুলিয়াস সিজারই ছিলেন সেই মানুষ। পশ্চিমা সভ্যতার কাছে এটি হয়তো একটি আদর্শ সরকার পরিচালনা ব্যবস্থা কিন্তু বিভিন্ন জাতিকে সমান কাজের আওতায় আনার ব্যবস্থাটি সেখানে সফল হয়নি। অনেক রোমানই ছিল যারা নিজেদেরকে রাজ্যের নেতা মনে করত আর অন্যদের পাত্তাই দিত না। কোনো সন্দেহ নেই, এই অহংকারই জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করার প্রথম উসকানি হিসেবে কাজ করেছিল।

সম্রাট অক্টোবিয়ান আগস্টাস

অক্টাভিয়ান দায়িত্বে আসার পরপরই বুঝতে পেরেছিলেন যে সরকারকে আবার ঢেলে সাজাতে হলে একনায়কতন্ত্র দরকার। কিন্তু তার দাদার ভাইয়ের পরিণতি দেখে তিনি এটুকু বুঝতেন যে বিষয়টি খুব সাবধানে নাড়াচাড়া করতে হবে। তাই তিনি ক্ষমতা পুরোপুরি কুক্ষিগত করে রাখতেও চাননি আবার একেবারে তা ইতালির বাইরে ছড়িয়েও দিতে চাননি। দুটো পদক্ষেপই তার জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন করেছিল এবং তাকে হত্যাকারীদের ছুরির কাছাকাছি টেনে নিয়ে গিয়েছিল। তবু প্রজাতন্ত্রটিকে সুগঠিত করতে রোমানরা সবসময় যে শাসনব্যবস্থায় অভ্যস্ত ছিল, তা-ও বজায় রাখতে চাইতেন তিনি। আর প্রকৃতপক্ষে তিনি সেটাই করেছিলেন। তিনি জুলিয়াস সিজারের বসানো প্রত্যন্ত অঞ্চলের সিনেট সদস্যদের উঠিয়ে দিলেন আর শুধু যারা রোমের কায়দাকানুনে অভ্যস্ত তাদেরই রাখলেন। এরপর থেকে সিনেটরদের তিনি নিজের মত অনুযায়ী চালাতেন। আর এভাবেই সিনেটের পুরো কর্তৃত্বটা চলে এলো ইতালিয়ানদের হাতে।

অক্টাভিয়ান সরকার চালানোর জন্য সিনেটে বিতর্কসভার আয়োজন করতেন। আগের সমস্ত কাঠামো নিয়ে সেখানে আলোচনা হতো, সে সবের ব্যাপারে সবার মতামত জানতেন , সিদ্ধান্ত নিতেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যা জানার জন্য সেখানকার নিম্নস্তরের কিছু কর্মচারির সাহায্য নিতেন। কিন্তু যতই দায়িত্ব যার ওপরেই থাকুক না কেন, সবাই জানত, অক্টাভিয়ানই সব সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক। ( তিনি নিজেই সব সরকারি দপ্তরের কলকাঠি নাড়েন। ) তিনি নিজে ঠিক করতেন কে কখন সিনেটর হবেন আর কে সে পদ থেকে নেমে যাবেন। খোদ সিনেটের সকলেও তা জানত। যদিও দেখা যেত সিনেটের সদস্যরা বিতর্কসভায় বেশ মন খুলে কথা বলছেন কিন্তু তর্কের শেষে অক্টাভিয়ান যা সিদ্ধান্ত নিতেন, সেটাই বাস্তবায়িত হতো।

অক্টোবিয়ান আগাস্টান Credit: Wikipedia

অক্টাভিয়ান দেশের সমস্ত সম্পদ নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে রেখেছিল। তার এই চালে দেশের সব মধ্যম আয়ের মানুষেরা ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে লাগল। সম্পদ বলতে তারা ল্যাটিন ভাষায় ঘোড়াকে বুঝত। এই ঘোড়ার জন্যই মধ্যম আয়ের মানুষদের ডাক পড়ত। সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য আহ্বান করলে নিজেদের ঘোড়া আর যুদ্ধ সরজ্ঞাম নিয়ে তাদের আসতে হতো। তারা তখন হয়ে যেত অশ্বারোহী সেনাদলের অংশ। নিম্ন আয়ের মানুষেরা পায়ে হেঁটে দলের সাথে যুদ্ধে যেত। ল্যাটিনে ঘোড়ার প্রতিশব্দ অনুযায়ী তাদের দলটিকে ‘ ক্যাভালিয়র ‘ বলে ডাকা হতো। কখনও আবার মধ্যযুগীয় সেনাবাহিনীর মতো তাদের ‘ নাইট ’ নামেও ডাকা হতো। কিন্তু মধ্যযুগীয় নাইটরা রোমান যোদ্ধাদের থেকে অনেক অন্যরকম ছিল।

ঘোড়ার মালিকদের সম্পত্তি এত বেড়ে গেল যে তারা সিনেটর হবার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলল। কিন্তু তারা সিনেটরের পরিবারভুক্ত ছিল না। অক্টাভিয়ান তাদের কাউকে কাউকে সিনেটর পদে বসালেন আর বাকিদের শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে। তারা রাজ্যের সরকারি কর্মচারি হয়ে গেল। বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পেয়ে এভাবে মধ্যম আয়ের মানুষেরা অক্টাভিয়ান আর তার বংশধরদের অনুগত হয়ে গেল। সেনাবাহিনীর ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল অক্টাভিয়ানের শক্তির পরিচয়। সেনাবাহিনী তাকে সবসময় সম্মান করত কারণ একমাত্র তার কাছেই সেনাবাহিনীকে চালানোর মতো পয়সা ছিল।

অক্টাভিয়ান সতর্কভাবে সেনাবাহিনীর দশ হাজার সদস্যদেরকে ইতালির দৈর্ঘ্য প্রস্থ অনুযায়ী ছড়িয়ে রাখলেন। এই দলটিই হয়ে দাঁড়াল অক্টাভিয়ানের প্রিতোরিয়ান বাহিনী ( আগের দিনে সেনাপ্রধানদের দেহরক্ষী বাহিনীকে প্রিতোরিয়ান নামে ডাকা হতো )। প্রিতোরিয়ান বাহিনী হয়ে গেল অক্টাভিয়ানের নিজস্ব সেনাবাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যরা হাতে ভেলভেটের দস্তানার নিচে আরেকটি লোহার দস্তানা পরা শুরু করল।

এছাড়া শুধু রোমের আইনকানুন রক্ষার জন্য ১৫০০ সদস্যের একটি বিশেষ পুলিশ বাহিনী ছিল । অক্টাভিয়ানের আমলের আগের পুরো শতাব্দী ধরে রাস্তাঘাটে যে হানাহানি আর মারামারি চলে আসছিল, বিশেষ পুলিশবাহিনী সেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি সাধন করল। ইতালিতে সেনাবাহিনীর যে অংশটা থাকত, তারা অবশ্য সেনাবাহিনীর বৃহৎ অংশ নয়। সেখানে ত্যক্তবিরক্ত সেনাপ্রধানেরা ইচ্ছে করলে সিনেটের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করে আকস্মিক বিদ্রোহের সৃষ্টি করতে পারত।

রোমান বাহিনীর প্রায় পুরোটাই (আঠাশটি দল , প্রতি দলে ছয় হাজার করে যোদ্ধা ছাড়াও আরও কিছু সাহায্যকারী দল মিলে চার লাখেরও বেশি মানুষ) সাম্রাজ্যের সীমানার দিকে পাহারারত ছিল। সীমানার পাশের দুর্ধর্ষ উপজাতিদের আক্রমণের আশঙ্কায় তাদের সেখানে রাখা হয়েছিল। এভাবে সেনাবাহিনীকে ব্যস্ত রাখতেন অক্টাভিয়ান, তাদের যখন যেখানে খুশি যেতে বলতেন। নিজের ইচ্ছেমতো অক্টাভিয়ান বাহিনীটিকে ইতালিয়ান উচ্চবর্ণের মানুষের একটি দল বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।

আরো পড়ুন   স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রাচীন কালের কিছু জঘন্য পদ্ধতি

বলা হতো,এমন মানুষদেরই তিনি বেছে নিয়েছেন যেন সেনাবাহিনীতে থাকার কারণে রোমের জন্য তাদের আলাদা টান থাকে। কিন্তু আসলে অন্য সব দূরবর্তী অঞ্চলের উপরে কর্তৃত্ব বজায় রাখতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তারপর আর কী, রোম ছাড়াও অন্য সব অঞ্চলের উপরে ছড়ি ঘোরানোর দায়িত্ব সিনেটই পেয়ে গেল। অবশ্য এই আইন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য শিথিল ছিল যেখানে কিনা কোনো সেনাসদস্যকে বসানো হয়নি। দেশের সীমানায় অবস্থানকারী সেনাসদস্যরা সরাসরি অক্টাভিয়ানের অধীনে ছিল। এমনকি তাদের ব্যাপারে যেসব সিদ্ধান্ত সিনেট নিত, সেখানেও অক্টাভিয়ান নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করতে ভুলতেন না। প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনীর কোনো অংশকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ করার কথা নয়।

সিনেটের সদস্যরা জানত যে সেনাবাহিনীর কাজে নাক গলাতে গেলে তারা নিজেরাই অরক্ষিত হয়ে যাবে। সেনাবাহিনীর স্বার্থে আঘাত লাগলে সেনা সদস্যরা তাদের মেরে ফেলতে কোনো দ্বিধা করবে না। তবে সিনেটররাও নিতান্ত ভদ্র ছিলেন বলে কোনো ঝামেলা হয়নি।

খ্রিস্টপূর্ব ২৭ সালে অক্টাভিয়ান ঘোষণা দিলেন যে দেশে আর কোনো জরুরি অবস্থা নেই। শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে আর সমস্ত উত্তেজনাও শেষ হয়েছে। এ কারণে তিনি সেনাবাহিনীর তদারকিসহ অনেকগুলো দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন। অবশ্য সিনেটের সদস্যরা জানত, এটা লোকদেখানো কাজ। অক্টাভিয়ান আসলে চাইতেন যে সিনেটের ইচ্ছেতেই যেন সেনাবাহিনীর দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়। তাহলে আইনত তিনি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন আর অনধিকার চর্চা করা হচ্ছে বলে কেউ তার দিকে আঙ্গুল ওঠাতে পারবে না।

সিনেট চুপচাপ নিজেদের কাজ করে যাচ্ছিল । তারা বিনয়ের সাথে অক্টাভিয়ানকের সেনাবাহিনীর দেখাশোনাসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করল । তাকে “ প্রিন্সেপ ” মানে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের উপাধি গ্রহণ করতেও অনুরোধ করা হলো । ( এই ‘ প্রিন্সেপ ‘ শব্দটি থেকেই ‘ প্রিন্স ‘ বা ‘ রাজকুমার ‘ শব্দটি এসেছে । ) খ্রিস্টপূর্ব ২৭ সালে, সে সময় তিন শতাব্দীর রোমান আইনকানুনের সূচনা হয়েছিল। একে বলা হয় “ প্রিন্সিপেট ”।

সে বছরই অক্টাভিয়ানকে “ অগাস্টাস ” উপাধি দেয়া হয় যা আগে শুধুমাত্র দেবতাদের নামে ব্যবহার করা হতো। এই নামটি দেয়ার পেছনে কারণ ছিল যে মানুষটি ঠিক দেবতার মতো করেই পৃথিবীর ভালত্ব আরও বাড়িয়ে তুলবে অথবা তাতে আরও নতুন মাত্রা যোগ করবে। অক্টাভিয়ান উপাধিটি সাদরে গ্রহণ করেছিলেন আর ইতিহাসে তিনি অগাস্টাস নামেই সুপরিচিত। সে কারণে এই বইয়ে তাকে অগাস্টাস নামেই উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে সেনাবাহিনী তাকে কমান্ডার বা নেতা বলে ডাকা শুরু করেছিল । খ্রিস্টপূর্ব ৪৩ সালে সিজারকে আটক করে বিজয় ছিনিয়ে আনার পর থেকেই যেন উপাধিটি তিনি অর্জন করেছিলেন। এর থেকেই আধুনিক ইংরেজিতে তাকে “ এমপেরর , ” মানে , “ সম্রাট ” বলে ডাকা শুরু হয়েছিল। তাই অগাস্টাসই প্রথম রোমান সম্রাট হিসেবে কথিত আর তার রাজ্যকে বলা হয় রোমান সাম্রাজ্য।

জুলিয়াস সিজারের ভাইয়ের নাতি, তিনি এমনিতেই রাজকুমার ছিলেন, তারপরে আবার সম্রাট হলেও অগাস্টাস নিজেকে রাজা মনে করতেন না। তিনি সবসময় ভাবতেন এই রোমান সাম্রাজ্য বেশিদিন টিকবে না। যদিও তিনি ছিলেন সর্বেসর্বা কিন্তু ক্ষমতার তেমন অপব্যবহার করতেন না। নিজের নামের জোরে রাজা হয়ে বসে না থেকে তিনি প্রতিবছর নির্বাচনের মাধ্যমে কনসল ( প্রাচীন রোমের শাসক ) হতে পছন্দ করতেন। ( রোমের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর একবার করে কাউন্সিলের নির্বাচন হতো । )

অগাস্টাস নিজের সাথে আরও একজনকে নির্বাচনে রাখতেন। কাগজে কলমে তার আর অগাস্টাসের ক্ষমতা একরকমের হলেও বাস্তবে তা ছিল না। অন্য কনসল কোনো স্বপ্নের মধ্যে থাকত না, এই বাস্তবতাটি সে জানত। পরবর্তীকালে অগাস্টাস রোমের কনসল পদ থেকে অব্যাহতি নেন। একেক বছরে একেকজন সিনেটরকে পুরস্কারস্বরূপ তিনি কনসল বানাতেন। কনসল হয়ে দেশের আইনকানুন নিয়ে কাজ করার চেয়ে আজীবন রোমের লোকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত থাকার জন্য অগাস্টাস নিজেকে ওই পদ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি নিজেকে “ পন্টিফেক্স ম্যাক্সিমাস ” বা সর্বোচ্চ পুরোহিত হিসেবে ঘোষণা করলেন। তারপর একটার পর একটা পৃথক দপ্তরের দায়িত্ব নিতে থাকলেন।

যেহেতু বেশিরভাগ দপ্তরই ছিল সম্রাটের নিজের অধীনে, তাই সরকারের নীতি নির্ধারণের বেলায় তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতেন। খুব সামান্য কিছু মানুষ মনে করত যে দেশের সরকার ব্যবস্থায় নতুন কোনো পরিবর্তন এসেছে। কেবল কোথাও কোনো যুদ্ধ চলছিল না- এটাই এক কথায় ভালোর দিকে যাত্রার পক্ষে বিরাট বড় একটি বিষয় ছিল। শুধু সিনেটররা সেই সময়কে আবার ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখে যেত যখন কিনা তারাই ছিল নেতা। কেবল সামান্য কিছু বুদ্ধিজীবী সরকারের চালটি ধরতে পেরেছিল। তারা মাঝে মধ্যে আবার আগের মতো সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানাত যে পদ্ধতিটা তাদের স্মৃতি থেকে অথবা ইতিহাস জেনে বেশি সঠিক বলে মনে হতো।

যতই দিন যেতে লাগল ততই যেন তাদের কাছে প্রাচীন পদ্ধতির মূল্য বেড়ে যেতে লাগল। কেবল অগাস্টাসের একনায়কতন্ত্রই যে তাকে রোমের শাসনকর্তা বানিয়ে রেখেছিল, তা নয়। কিছু টাকাপয়সার ব্যাপারও ছিল। রোমান প্রজাতন্ত্রে সবসময়ই সরকার চালানোর জন্য টাকার জোগাড় করার অদক্ষ এক নিয়ম ছিল। প্রজাদের দেয়া কর বেশিরভাগ সময়ে যারা আদায় করছে তাদের পকেটেই চলে যেত আর সরকার পরিচালিত হতো চারদিকের দখলকৃত এলাকার লুটপাটের টাকা দিয়ে।

কোনো প্রজা যদি দেশের বাইরের কোনো জায়গা দখল করতে পারত, তবে পুরস্কার হিসেবে তার কর মওকুফ করে দেয়া হতো। অনেক প্রজার জীবন এভাবে রাখঢাকহীনভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের লুটের টাকায় চলত। অগাস্টাসের আমলের আগের শতাব্দীতে প্রাদেশিক শক্তিগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রথমত অতিরিক্ত কর বসিয়ে আর তার ওপরে দখল ও ডাকাতি করে তাদের একেবারে পথে বসানো হয়েছে।

প্রাদেশিক সরকারের লোকেরা নিজেদের পকেট ভারী করেছে। তারপর সবশেষে বিভিন্ন প্রদেশের সাথে যুদ্ধরত সেনাপ্রধানদের চাপের মুখে তাদের চরম ক্ষতি করা হয়েছিল। অর্থের প্রয়োজন চার দিকে এমনভাবে উথলে উঠছিল আর সেখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে টাকার পরিমাণ এতই কম ছিল যে যখন যুদ্ধ জয়ের উল্লাসের শেষের পর্যায়ে তখন ছিনিয়ে আনা রসদও ফুরিয়ে এসেছে।

আরো পড়ুন   মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম বছর: খ্রীস্টপূর্ব ৪৬ সালে ৪৪৫ দিনের বছর

সে সময়ে রোমান সাম্রাজ্য দেউলিয়া হতে বসল। অর্থনৈতিক এই ধস থেকে দেশকে বাঁচাতে এমনকি অগাস্টাসও নতুন কোনো যুদ্ধজয়ের পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হলেন। রোমের সেনাবাহিনীর হাতের নাগালে থাকা সব সভ্য আর ধনী জায়গাগুলোকে ততদিনে তারা গিলে খেয়ে ফেলেছে। এরপর আর যা কিছু বাকি ছিল তা হলো কিছু অসভ্য জাতি, যাদের দখল করে যতই অমানবিকভাবে চেপে পয়সা বের করতে চাওয়া হোক না কেন, তেমন কিছুই পাওয়া যাবে না। কিন্তু এটা বেশ স্পষ্ট ছিল যে আগের মতোই যদি ভোগদখলের রাজনীতি চলতে থাকে তো রোম নির্ঘাত বিশৃঙ্খল একটা জাতিতে পরিণত হবে। সেনাসদস্যদের যদি কোনো কারণে যথাযোগ্য পারিশ্রমিক না দেয়া যায় তো তারা সাথে সাথেই বিদ্রোহ করে বসবে। এভাবে রোম হয়তো লড়তে লড়তেই ধ্বংস হয়ে যাবে যেমন তিন শতাব্দী আগে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের আমলে হয়েছিল।

অগাস্টাস বাধ্য হয়ে সৎ একটি উপায়ে রাজ্য পরিচালনার কথা ভাবলেন। প্রদেশের গভর্নরদের একটি নির্দিষ্ট বেতন বেঁধে দেয়া হলো। কোনোরকম অসাধু উপায়ে সেই বেতনের সাথে যদি একটি টাকাও যোগ করা হয়, তবে সাথে সাথে তার উৎস খতিয়ে দেখা হবে। তবে যারা বেআইনীভাবে কাজ আদায় করত, তারা জানত যে সিনেটরদের আগেও সহজে পটিয়ে ফেলা যেত আর ভবিষ্যতেও যাবে।

সম্রাটের অবশ্য অসাধু আয়ের প্রয়োজন ছিল না, কারণ তিনিই ছিলেন দেশের সবচেয়ে ধনী। কোষাগার থেকে একটি পয়সাও যদি কোনো সরকারি কর্মচারী চুরি করত, তো সে সম্রাটের তহবিল থেকেই চুরি হতো। তাই অগাস্টাস সেসব ব্যাপারে এক চুল নরম হবেন না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাছাড়া অগাস্টাস কর আদায়েরও নতুন পদ্ধতি চালু করলেন যাতে করে করের সিংহভাগ সরাসরি চলে যায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আর আদায়কারীর পকেটে যায় খুবই সামান্য।

এ ধরনের নতুন নিয়মকানুন প্রদেশগুলোকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিলো। জুলিয়াস সিজারের আমলে তারা রাজনৈতিকভাবে যতটা নিগৃহীত হয়েছিল, সেটা কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারল। অবশ্য রোমের অভিজাত মানুষদের হাতেও কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না। তবু প্রদেশগুলো আগের হতাশা কাটিয়ে এখন অন্তত একটা সৎ আর নিষ্ঠাবান সরকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছিল।

তারা সরকার প্রধানের অধীনে সামনের দিনগুলোতে আশু উন্নতির দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু কর আদায়ে নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা বা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সত্ত্বেও রাজ্যের সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষ করে যখন থেকে অগাস্টাস রোম শহরকে ঢেলে সাজানোর বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। ( ইতিহাসে বলা হয় তিনি শহরটি পেয়েছিলেন ইটের তৈরি আর বদলে ফেলেছিলেন মার্বেলে । )

মিশর দখল

আগুন প্রতিরোধের জন্য তিনি একটি বাহিনী গঠন করছিলেন আর রাজ্য থেকে বিভিন্ন দিকে যাতায়াতের জন্য তৈরি করছিলেন রাস্তাঘাট। অগাস্টাস নিজের আধিপত্য বিস্তারের জন্য রাজ্যের সম্পদ ব্যবহার করছিলেন। এ্যান্টনি আর ক্লিওপেট্রাকে হারানোর পরে তিনি এমনভাবে মিশরের দখল নিয়ে নেন যেন মিশর কেবল রোমের দখলকৃত একটি অঞ্চলই নয় , বরং তার নিজস্ব সম্পত্তি। তার কাছে বিশেষ অনুমতি না নিয়ে কোনো সিনেটরও মিশরে ঢুকতে পারত না।

Credit: givaga/Shutterstock

ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মিশরই ছিল সে সময় সবচেয়ে ধনী দেশ। বছরে একবার নীলনদের বন্যায় পুষ্ট মিশর তখন আশাতীত ফসল উৎপাদন করত । তাই স্বভাবতই মিশর হয়ে দাঁড়াল ইতালির শস্যভাণ্ডার। আরেক দিকে মিশরের কঠোর পরিশ্রমী কৃষকের দেয়া কর সরাসরি অগাস্টাসের কোষাগারে জমা হতে লাগল। আরও অনেক উপায়েই অগাস্টাসের কোষাগার সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। ( অনেক ধনী মানুষ নিজেদের জমাজমি , বাড়িঘর ছেড়ে অভিবাসী হয়ে যাওয়ার আগে নিজেদের সম্পত্তির কিছু অংশ অগাস্টাসকে দিয়ে যেতে লাগল ঘুষ হিসেবে। দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কখনও কৃতজ্ঞতায় আবার কখনও নিজেদের উত্তরাধিকারীরা যেন ঠিকমতো সম্পত্তি ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে। )

রাজ্যের বিভিন্ন প্রয়োজনে অগাস্টাস নিজের পকেট থেকে খরচ করতে পারতেন। সরাসরি তার হাত দিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ বিভিন্ন খাতে প্রেরিত হলে তার প্রতি সকলের আস্থাও বেড়ে যাবে। তাই তিনি নিজেই সেনাবাহিনীর সব খরচ নিজের তহবিল থেকে দেয়া আরম্ভ করলেন আর সেনাবাহিনীও একমাত্র তারই অনুগত হয়ে থাকল। অগাস্টাস ইতালিকে সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন।

ধর্মীয় অনুশাসন

ধর্মীয় যেসব আচার আচরণ প্রাচ্য দেশগুলো থেকে অনুপ্রবেশ করেছিল, বিশেষ করে খুবই জমকালো আর নাটকীয় নিয়মকানুনগুলো সুচারুভাবে পালনে অগাস্টাস রোমের অধিবাসীদের উৎসাহিত করছিল। রোম প্রাচ্যের যে দেশগুলো দখল করে সেখান থেকে দাস হিসেবে বন্দী মানুষ এনেছিল তারাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল সেই ধর্মীয় অনুশাসন। রোমে নিয়ে আসার পরে তাদের মুক্ত করা হলে রোমের সংস্কৃতির বাইরে পৃথক সংস্কৃতির রীতিনীতি চালু করতে তারা তৎপর হয়ে উঠল।

Image copyright

রোমের প্রাচীন রীতিনীতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে মানুষ নতুন সংস্কৃতির মোহে ডুবে যাক, অগাস্টাস তা চাইতেন না। আবার মুক্তি পাওয়া প্রাচ্য দাসদের স্বাধীনতা হরণেও তিনি তেমন কোনো পদক্ষেপ নেননি। এভাবেই ক্ষমতায় আসার পর থেকে অগাস্টাস রোম শাসন করলেন পয়তাল্লিশ বছরব্যাপী।

এর মধ্যে রোমের উন্নতি হলো, শান্তিও প্রতিষ্ঠিত হলো। প্রশ্নাতীতভাবে অগাস্টাসের শাসন ইতিহাসের পাতায় রোমের ঘুরে দাঁড়ানো হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। রাজ্য শাসনের বিষয়ে যে গভীর প্রজ্ঞা তার ছিল তা যদি না থাকত আর এতদিন জীবিত থেকে শাসনকাজ চালিয়ে যেতে না পারতেন, তবে রোমে প্রাদেশিক যুদ্ধ লেগেই থাকত। অগাস্টাসের বিচক্ষণ শাসন না পেলে হয়তো কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই ইতালি টুকরো টুকরো হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ত। কেবল কঠোর শাসনের জোরেই রাজ্যটি চারশ ‘ বছর ধরে অটুট শক্তিধর হয়ে টিকে রইল। সমস্ত ইউরোপের উপরে রোমান সংস্কৃতির দৃঢ় প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট সময় তারা পেয়েছিল।

Leave a Comment