ইতল বিতল কবিতা — সুফিয়া কামাল
ইতল বিতল গাছের পাতা গাছের তলায় ব্যাঙের ছাতা বৃষ্টি পড়ে ভাঙে ছাতা ডোবায় ডোবে ব্যাঙের মাথা।
ইতল বিতল গাছের পাতা গাছের তলায় ব্যাঙের ছাতা বৃষ্টি পড়ে ভাঙে ছাতা ডোবায় ডোবে ব্যাঙের মাথা।
যেসব মুসলমান হিন্দুদের বিধর্মী মনে করে, তাদের ক্ষতি করতে চায়, আমি তাদের বলি তোমরা কারা? খুব বেশি হইলে চার-পাঁচ পুরুষ আগে তোমরা কারা ছিলা? তোমাদের বাপ-দাদার বাপ-দাদারা ছিলেন হয় হিন্দু নয় নমঃশূদ্র। এ দেশের হিন্দু আর মুসলমানের একই রক্ত। কতজন আরব ইরান-আফগানিস্তান হইতে আসিয়াছে? পাঁচ পুরুষ আগে যারা ছিলো তোমাদের পূর্বপুরুষ আজ তাদের গায়ে হাত তুলতে তোমাদের বুক কাঁপে না? তোমরা কি মানুষ না পশু?
আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা— ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হলো ব্যথা! ছায়া ধরার ব্যবসা করি তাও জানো না বুঝি? রোদের ছায়া, চাঁদের ছায়া, হরেক রকম পুঁজি।
খোলা জায়গায় মাথার ওপরে দিনরাত আমরা আকাশ দেখতে পাই। গাছপালা, নদীনালা দুনিয়ায় কোথাও আছে, কোথাও নেই। এমনকি ঘরবাড়ি, জীবজন্তু, মানুষও সব জায়গায় না থাকতে পারে। কিন্তু আকাশ নেই, ভূপৃষ্ঠে এমন জায়গা কল্পনা করা শক্ত। দিনের বেলা সোনার থালার মতো সূর্য তার কিরণ ছড়ায় চারপাশে। এমনি সময়ে সচরাচর আকাশ নীল। কখনো সাদা বা কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। ভোরে বা সন্ধ্যায় আকাশের কোনো কোনো অংশে নামে রঙের বন্যা। কখনো-বা সারা আকাশ ভেসে যায় লাল আলোতে। রাতের আকাশ সচরাচর কালো, কিন্তু সেই কালো চাঁদোয়ার গায়ে জ্বলতে থাকে রুপালি চাঁদ আর অসংখ্য ঝকঝকে তারা আর গ্রহ। আগেকার দিনে লোকে ভাবতো, আকাশটা বুঝি পৃথিবীর ওপর একটা কিছু কঠিন ঢাকনা। কখনো তারা ভাবতো, আকাশটা পরতে পরতে ভাগ করা।
একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ আগামীকাল, কিংবা আগামী সপ্তাহে, পরের মাসে, পরের বছরে কী ঘটতে চালছে তা সম্বন্তে ভবিযাদ্বাণী করতে পারেন। যদি সেগুলি না ঘাট তার কারণ যুক্তিগ্রাহ্যভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপনার দক্ষতাও তার থাকে।
চপল পায় কেবল ধাই, কেবল গাই পরীর গান, পুলক মোর সকল গায়, বিভোল মোর সকল প্রাণ। শিথিল সব শিলার পর চরণ থুই দোদুল মন, দুপুর-ভোর ঝিঁঝির ডাক, ঝিমায় পথ, ঘুমায় বন।
একদিন বিকেলে হন্তদন্ত সাবু বাড়ির উঠান থেকে 'মা মা' চিৎকার দিতে দিতে ঘরে ঢুকল। জৈতুন বিবি হকচকিয়ে যায়। রান্নাঘরে পাক করছিল সে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে শুধায়, কী রে-এত চিক্কর পাড়স ক্যান? - মা, ঢাকা শহরে গুলি কইরা মানুষ মারছে- কে মারছে? পাঞ্জাবি মিলিটারি। দেখা যায় সাবু খুব উত্তেজিত। মুখ দিয়ে কথা তাড়াতাড়ি বের করে দিতে চাইলেও পারে না। কারণ, শরীর থরথর কাঁপছে। হাতের মুঠি বারবার শক্ত হয়। মা, একজন দুজন না। হাজার হাজার মানুষ মারছে।
পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী! আস্তে একটু চল না ঠাকুরঝি— ওমা, এ যে ঝরা-বকুল! নয়? তাইতো বলি, বসে দোরের পাশে, রাত্তিরে কাল- মধুমদির বাসে আকাশ-পাতাল- কতই মনে হয়।
"ক্ষমা করো পৃথিবী তাকে আমি ঘৃনা করতে পারিনি। তাকে আমি নিষ্ঠুর মৃত্যু দিতে পারিনি! যার হাতের পাঁচটি আঙ্গুল আমার নির্ভরতা, যার বুকের পাঁজরে লেগে থাকা ঘামের গন্ধ আমার সবচেয়ে প্রিয়। যার উষ্ণ ঠোঁটের ছোয়া আমার প্রতি দিনের অভ্যাস, যার এলোমেলো চুলে হারিয়ে যাই বারংবার যার ভালোবাসার আহবানে সব কিছু তুচ্ছ করে ছুটে যায়, যার মিষ্টি সোহাগে অন্য জগতে হারিয়ে যায়। তার কষ্ট আমি কি করে সহ্য করি। লোকে বলে স্বামীর বা পাজরের হারে স্ত্রী তৈরি, তাহলে যার পাজরে আমার সৃষ্টি তার আর্তনাদ কি করে শুনি! এই কঠিন কাজ আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ও পৃথিবী সবাইকে বলে দিও, আমার কবর যেন আমার স্বামীর কবরের ঠিক বা পাশেই হয়, আমি তাকে ভালোবাসি, যেমন সত্য চন্দ্র সূর্য তেমন সত্য আমি তাকে ভালোবাসি"!!!
সন্ধ্যের দিকে জাহাজ সুয়েজ বন্দরে পৌঁছল। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ঘন নীলাকাশ কেমন যেন সূর্যের লাল আর নীল মিলে বেগুনি রং ধারণ করছে। ভূমধ্যসাগর থেকে একশ মাইল পেরিয়ে আসছে মন্দমধুর ঠান্ডা হাওয়া। সূর্য অস্ত গেল মিশর মরুভূমির পিছনে। সোনালি বালিতে সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে সেটা আকাশের বুকে হানা দেয় এবং ক্ষণে ক্ষণে সেখানকার রং বদলাতে থাকে। তার একটা রং ঠিক চেনা কোন জিনিসের রং সেটা বুঝতে-না-বুঝতে সে রং বদলে গিয়ে অন্য জিনিসের রং ধরে ফেলে।
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে। সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে॥ জানি নে তোর ধন রতন আছে কি না রানির মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।॥
এদেশের আলস্য, ঔদাস্য, নিদ্রা, তন্দ্রা ও জড়তাকে দূর করিয়া দেশের প্রাণে প্রবল কর্মশক্তি জাগাইয়া দিতে হইবে; সমগ্র দেশে এমন ধর্মের প্রভাব বিস্তার করিতে হইবে যাহার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হইয়া, যাহার শক্তিতে শক্তিশালী হইয়া এদেশ আবার জাগিয়া উঠিবে।
কহিলা হবু, 'শুন গো গোবুরায়, কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র— মলিন ধুলা লাগিবে কেন পায় ধরণী-মাঝে চরণ-ফেলা মাত্র! তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি, রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি। আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি, রাজ্যে মোর একি এ অনাসৃষ্টি! শীঘ্র এর করিবে প্রতিকার, নহিলে কারো রক্ষা নাহি আর।'
এবার মোছাব মুখ তোমার আপন পতাকায়। হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখভোলানিয়া গান গায়। মোছাব তোমার মুখ আজ সেই গাঢ় পতাকায়। ক্রুর পদাতিক যত যুগে যুগে উদ্ধত পায়ের দাগ রেখে গেছে কোমল পলির ত্বকে, বিভিন্ন মুখের কোটি অশ্বারোহী এসে খুরে খুরে ক্ষতময় করে গেছে সহনীয়া মাটি, লালসার লালামাখা ক্রোধে বন্দুক কামান কত অসুর গর্জনে চিরেছে আকাশ পরিপাটি, বিদীর্ণ বুক নীল বর্ণ হয়ে গেছ তুমি, বাংলাভূমি নত হয়ে গেছে মুখ ক্ষোভে ও লজ্জায়।
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল। তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন। জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।