You are currently viewing কৃষকদের বিদ্রোহ: মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে সামন্তবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এক বিপ্লব

কৃষকদের বিদ্রোহ: মধ্যযুগের ইংল্যান্ডে সামন্তবাদের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এক বিপ্লব

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারিটি সংঘটিত হয়েছিল ১৩ শতকের ইউরোপে। বুবোনিক প্লেগ নামক এই রোগটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো ইউরোপ জুড়ে। শুধুমাত্র ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত মাত্র ৪ বছরেই ইউরোপের প্রায় ৭০ থেকে ২০০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। যা ছিল তখনকার ইউরোপের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০–৫০% এর মতো। এই ভয়াবহ মহামারিকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘ব্ল্যাক ডেথ’; বাংলায় যাকে বলা হয় কালো মৃত্যু।

 

প্লেগ রোগটি যে কেবল একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই চলেছিল তারপর থেমে যেতো তা কিন্তু নয়। কিছুকাল চলার পর তার প্রভাব কমে যেত; কিন্তু ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলের কিছু কিছু স্থানে ঠিকই চলমান থাকত। তাই বলা চলে মধ্যযুগের ইউরোপের প্রায় পুরোটা সময়ই প্লেগ রোগ সম্পর্কে ইউরোপের জনগণ বেশ আতংকেই থাকতেন। তবে ১৩ শতকের এই ভয়াবহ মহামারি ছিল মধ্যযুগের ইউরোপের অন্যতম বড় বিপর্যয় গুলোর একটি। আর এই ভয়াবহ বিপর্যয়ই ফলেই শোষিত কৃষকদের সুযোগ করে দিয়েছিল নতুন এক বিপ্লব সৃষ্টির; যা ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছে ‘ইংল্যন্ডের কৃষক বিপ্লব’ নামে।

 

দীর্ঘকাল ধরে চলমান এই মহামারির ফলে যে সকল মানুষ মারা গিয়েছিল তাদের বৃহৎ একটি অংশই ছিল সমাজের কৃষক, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া নিপীড়িত শ্রেণীর মানুষজন। আর এর ফলে ইংল্যান্ডে দেখা দেয় কৃষকের সংকটের। তখনকার ইংল্যান্ডের সমাজ ব্যবস্থা ছিল সামন্ততান্ত্রিক। অভিজাত শ্রেণীর মানুষদের হাতে ছিল জমির মালিকানা আর সাধারণ কৃষকদের কোনো জমিই ছিলনা। তারা একপ্রকার দাসের মতো খেটে যেতেন। বিনিময়ে নামমাত্র মজুরি পেতেন। আর সেই সাথে ছিল রাজার দেওয়া করের বোঝা।

 

প্লেগ মহামারির ফলে কৃষকের সংখ্যা ভয়াবহ রকমের কমে গেলেও; অভিজাতদের সংখ্যা মানে যাদের লর্ড নামে ডাকা হয় তাদের সংখ্যার কিন্তু তেমন পরিবর্তন হলো না। প্লেগ মহামারির ফলে যেহেতু কৃষকের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কৃষকেরা এই সুযোগে আরো বেশি মজুরি দাবি করতে থাকেন; যা ছিল তাদের পরিশ্রমের সঠিক অধিকার। এই পরিস্থিতি তখন জমির মালিকদের জন্য অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে তারা যেমন কৃষকদের  বেশি মজুরি দিতে রাজি ছিলেন না; আবার একই সাথে তারা তাদের জমি চাষ না করে খালি ফেলে রাখতেও পারছিলেন না। স্বাভাবিকভাবেই, এই জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তখন তাদের কিছু একটা করার প্রয়োজন ছিল।

 

যেহেতু জমির মালিকেরা তখন মালিকরা পার্লামেন্টে বেশ শক্তিশালী ছিলেন। তারা নিজেদের স্বার্থে জোড় করে কিছু আইন পাস করতে চেয়েছিলেন। আর তাদের এই নীতি তখন বিপুল সংখ্যক কৃষকের জীবনের উপর অন্যায় ও অবিচার বয়ে আনে। ফলাফল স্বরূপ স্বাভাবিক ভাবেই কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা দাবি করেন যে, যতক্ষণ না বাজারের জিনিসপত্রের দাম না কমছে, ততোক্ষণ তাদের মজুরি কমানো যাবে না।

 

আর এভাবেই কৃষক বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। অসন্তুষ্ট মানুষজন তাদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন এবং শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকেন। সেই সময়ে আরো নির্দিষ্ট করে বললে ১৩৮০ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় রিচার্ড  ‘পোল ট্যাক্স’ (মাথাপিছু কর) নামক এক ধরণের কর আরোপ করার ফলে এই অসন্তোষ আরও বেড়ে যায়। তখন জন বল, ওয়াট টেলর, জ্যাক স্ট্র এবং আরও অনেকের নেতৃত্বে এই ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহে রূপ নেয়। তারা ‘পোল ট্যাক্স’সামন্ত প্রথা বাতিল করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন।

 

১৩৮১ সালে এই বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করে। ইংল্যান্ডের পূর্ব অ্যাঞ্জেলিয়া এবং পার্শ্ববর্তী কাউন্টিগুলোতে সর্বপ্রথম কৃষকদের এই অভ্যুত্থান ঘটে। মানুষের অভিজাতদের প্রতি রাগ ও ক্ষোভ এতোটাই বেড়ে গিয়েছিল যে; যেই অভিজাতদের দেখতে সাধারণ খেটে খাওয়া মজুর শেনীর মানুষেরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে যেতো; তারাই  বিভিন্ন জমিদার বাড়ি এবং রাজপ্রাসাদ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন। বিদ্রোহীরা জন অফ গন্ট-এর প্রাসাদ লুটপাট করেন এবং পুড়িয়ে দেয়; যিনি ছিলেন  ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড এর তৃতীয় পুত্র এবং রাজা দ্বিতীয় রিচার্ডের কাকা। এমনকি বিদ্রোহী কৃষকেরা টাওয়ার অফ লন্ডনে জোরপূর্বক প্রবেশ করেছিল এবং ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ ও কোষাধ্যক্ষকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে।

 

ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় রিচার্ড। Image Courtesy: Wikipedia

 

পরিস্থিতি তখন এতোটাই খারাপ হয়ে যায় যে; আন্দোলন দমন করার জন্য তখন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন তখন দ্বিতীয় রিচার্ড। এই বিদ্রোহের সময় তিনি ছিলেন খুবই তরুণ; বয়স মাত্র ১৪ বছর! বয়সে তরুণ হলেও রাজা এই আসন্ন বিপদ সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন। কিশোর রাজা তখন সাহসের সাথে বিদ্রোহীদের নেতা ওয়াট টেলরের সাথে দেখা করতে রাজি হয়েছিলেন। রাজা তখন বিদ্রোহীদের দাবি মেনে নেওয়ার প্রুতিশ্রুতি দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। বিদ্রোহীরা আন্দোলন থেকে নিজের গুটিয়ে নিলে রাজা তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন এবং কঠোরভাবে বিদ্রোহীদের হত্যা করে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

 

ওয়াট টেলরের নিষ্ঠুর মৃত্যু। age Courtesy: Anker Smith

 

মধ্যযুগে যখন শাসক শ্রেণীর মানুষদের সামনে খেটে খাওয়া মুজুর ও সাধারণ মানুষদের কোনো স্থানই ছিল না; তখন এই বিদ্রোহ ছিল অভিজাত সমাজের মানুষের জন্য একটি শিক্ষা। কৃষকদের এই বিদ্রোহ সেসময় ব্যর্থ হলেও এই বিদ্রোহ সামন্ততান্ত্রিক প্রথার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্যায় অবিচার মানুষকে প্রায়ই সহিংসতার দিকে নিয়ে যায় এবং এর থেকে কোনো পক্ষই কিছু অর্জন করতে পারে না। এই বিদ্রোহ আমাদের এটা শিক্ষা দেয় যে, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং আপোষমূলক মনোভাবই কেবল সমাজের বিভ্রান্তি ও সংঘাত দূর করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।

 

Feature Image Courtesy: The British Library

 

Author

  • Mehadi Bhuiyan

    শৈশব থেকেই ইতিহাস, মিথলজি আর শিল্পের অলিগলি আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হতো। ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা সেই বিস্ময়কে পরিণত করেছে ভালোবাসায়। আমি মনে করি, জগতকে বোঝার সেরা উপায় হলো পাঠ করা আর নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করার সেরা মাধ্যম হলো লেখা। তাই কেবল জানানোর জন্য নয়, বরং লিখতে ভালোবাসি বলেই আমার এই শব্দযাত্রা। নতুনের সন্ধানে বিরামহীন ছুটে চলা আর সেই অভিজ্ঞতার নির্যাসটুকুই আমি এখানে ভাগ করে নিই।

    লেখক ও সম্পাদক, মুখোশ.নেট

    View all posts