ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট (বুক রিভিউ)

যেকোন বই থেকেই সাধারণত জ্ঞান, মানসিক প্রশান্তি, জীবনবোধের শিক্ষা পাওয়া যায়। তবে কিছু কিছু বই জীবন দর্শন পরিবর্তন করার মত ক্ষমতা রাখে। তার মধ্যে ফিওদোর দস্তয়ভস্কির ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট অন্যতম। এই বইটিকে বিশ্বের সেরা ১০টি বইয়ের একটি বলা হয়। ফিওদোর দস্তয়েভ্স্কি তার এই বইয়ে তৎকালীন বৈষম্যের শিকার একটি সামজের চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসের মূল কাহিনি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র রাসকলনিকভ কর্তৃক একজন কুসীদজীবী মহিলা ও তার বোনকে হত্যা এবং হত্যার পর তার মানসিক ভারসাম্য হারানোর কাহিনি এবং মানসিক দ্বন্দ্বের পরিণতি দেখানো হয়েছে।

যেসব উপকাহিনি এখানে সৃষ্টি করা হয়েছে তা মূল কাহিনিকে বিকাশ ও পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে কতখানি সাহায্য করেছে তা অবশ্য বিচার্য বিষয়। দস্তয়ভস্কি সমাজ জীবনের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবন চিত্র অংকনে যতবেশি আগ্রহী ছিলেন বোধহয় ততখানি আগ্রহী ছিলেন না একটি শিল্পসম্মত সুন্দর নিটোল কাহিনি নির্মাণ করা। তবে সোনিয়া উপকাহিনি মূল কাহিনির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে মূল কাহিনিকে পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো রাসকলনিকভ। একেবারে নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। তবে নিম্নরুচির পরিবার ছিল না তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তার হয়েছে। ফলে বিশ্বজগৎ সম্বন্ধে ধ্যানধারণা গড়ে উঠেছে , বিশেষ বিশেষ তত্ত্ব সম্বন্ধে ও তার জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

রাসকলনিকভ ছাত্র হিসাবে খুব নিম্নমানের নয়। জানার আগ্রহ তার মধ্যে প্রবল এবং যা জেনেছে তাকে ছাপার অক্ষরে কাগজে প্রকাশ করার আগ্রহ তার আছে। বুদ্ধিজীবী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার একটা অদম্য আকাঙ্ক্ষা তার আছে, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ও সহানুভূতি তার মধ্যে প্রবল। মানুষের দুঃখে সে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে। কিন্তু কী কারণে সে কুসীদজীবী রমণী এলিওনা আইভানোভনাকে হত্যা করল তার কোনো সুনির্দিষ্ট যুক্তি লেখক উপস্থাপিত করতে পারেনি।

প্রথমত , রাসকলনিকভ কোনো অর্থনৈতিক কারণে মহিলাকে খুন করেনি যদিও অর্থের অভাব তার যথেষ্ট ছিল। অর্থের অভাবে এমনকি তার পড়াশুনাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তবু সে যে অর্থের অভাবে তা করেনি তা সে নিজেই স্বীকার করে বলেছে–“ And money was not the main thing I need , Soney when I killed , it was not so much money I needed as something else ….”

টাকার জন্য যে সে হত্যা করেনি এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই । কারণ হত্যা করার পরও সে বিশেষ কিছু টাকা চুরিও করেনি। দ্বিতীয়ত, সে একজন পাকা খুনি বা চোর নয়। কোনো কিছুর জন্যে বা নিজের স্বার্থের উদ্দেশ্য নিয়ে সে চুরি করেনি বা খুন করেনি। সে যে কেন খুন করেছে তা সে নিজেও জানে না।

রাসকলনিকভ মনে করে। খুন করাটা তার নেহাতই ক্ষণিকের একটা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। সত্যিই সে যে কেন খুন করেছিল তা তার অনুশোচনামূলক বিবৃতি থেকেও প্রকাশ পায়নি। রাসকলনিকভের খুন করার পিছনে কোনো অনিবার্য কারণ ছিল না।

আরো পড়ুন   ক্রিস্টোফার মার্লো: পাদরি হওয়ার স্বপ্ন দেখে হয়েছিলেন ঘোরতর নাস্তিক

তবে লেখক স্বয়ং একটা যুক্তি উপস্থাপিত করেছেন। যে তত্ত্ব ও যুক্তির উপর নির্ভর করে তিনি তাঁর নায়ককে দিয়ে খুন করাতে বাধ্য করেছেন, সে তত্ত্ব বা যুক্তি হলো এই যে নায়ক হলো আসলে নেপোলিয়নের ভাবাদর্শে দীক্ষিত একজন ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী।

লেখকের মতে জনগণ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত, এক সাধারণ, দুই অসাধারণ। সাধারণ মানুষের অনুগত হয়ে বাস করে এবং অনুগত হতে ভালোবাসে। অসাধারণ মানুষ কোনো নিয়মের অনুগত নয়। তারা নিয়ম ভেঙে নতুন কিছু নিয়ম সৃষ্টি করে। আর তারাই হয় পৃথিবীর শাসক। আসলে সত্যিই তাই।

ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নও হলেন সেই জাতীয় অসাধারণ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের মূর্ত প্রতীক। আর রাসকলনিকভ হলো তারই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। রাসকলনিকভ সমাজের প্রচলিত নিয়মকে ভেঙে কিছু কি একটা হতে চেয়েছিল? একজন কুসীদজীবীকে হত্যা করে সে কী ভেবেছিল সমাজের পরিবর্তন আসবে? সেই হহত্তর ভাবনার পরে প্রবল আত্মপ্রত্যয় রেখেই কি বলেছিল— “ the sole reason being that this plan of his was not a crime ? ”

সেই জন্যেই কি সে সোনিয়াকে তার খুনের ব্যাপারটাকে সাধারণ খুনের ব্যাপার হিসাবে গণ্য না করার জন্য অনুরোধ করেছিল আর বলেছিল— “ Is a Man louse ? ”

কুসীদজীবী মহিলাকে খুন করার জন্য সমাজের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি বা অশুভ শক্তিরা সমাজ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি , তবু তার ভাবনা, “ আমি একটা বিরাট কিছু ” অথবা ” অতিমানব ” এই অহং সর্বস্ব ভাবনাই তাকে বিপথে পরিচালিত করেছিল, তাকে যুক্তিহীন একটি জন্তুতে পরিণত করেছিল।

সেই বর্বর যুক্তিহীন জন্তুটাই তাকে প্রেরণা দিয়েছিল যে প্রেরণার হলে সে বলতে পেরেছিল – “ I decided to dare and I killed . ” এই অহং সর্বস্ব ভাবনার অন্ধ আবেগে মানুষ যে কতখানি নৈরাজ্যবাদী যুক্তিহীন জন্তুতে পরিণত হতে পারে তার প্রমাণ রাসকলনিকভ। ভাবনা যতই মহৎ হোক, রাসকলনিকভ যতই ভাবুক সাধারণ মানুষ বোকা, এবং এই বোকা মানুষগুলো কোনোদিন বুদ্ধিমান হবে না, কেউ তাদের বুদ্ধিমান করে তুলতে পারবে না– that men won’t change and no body can make them এবং whoever is firm and strong in mind and spirit can be master over them এই ভাবনা নিয়ে তার খুন করাটা কিন্তু অপরিহার্য হয়েছিল বলে মনে হয় না।

কারণ তার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের যোগ ছিল না। সে নিজেকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেছে এবং এককভাবে যেন সকলের নায়দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিয়েছে। এটা কি সম্ভব? যাইহোক, এখানে লেখকও কোনো বলিষ্ঠ যুক্তি তুলে ধরতে পারেননি। একথা ঠিক খুন করার পর রাসকলনিকভ অনুশোচনায় ভুগেছে। সে পেশাদার খুনি নয়। সে নিছক ভালো মানুষ । তাই অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে সে বলেছে – I killed myself , not the old momen! I simply went and did away with myself for eternity …. It was not to gain riches and power and become a benefactor to mankind that I killed Rublosh ! I simply killled ; I killed for myself , for myself alone . ”

আরো পড়ুন   নবনী উপন্যাস রিভিউ

তাহলে খুন করার পিছনে কোনো মহৎ ভাবনা নেই। এমনকি নিজেকে হত্যা করার পিছনেও কোনো অপরিহার্য কারণ নেই। তবে সে কেন খুন করল? নায়কের নিজের জষায়— that was the devil tempeted me ….. that led me on.

তবু লেখক তার নায়ককে মহৎ করেই সৃষ্টি করেছেন। কারণ তাকে খুনি বলে ধরার যখন কোনোরকম প্রমাণ নেই তখন সে নিজেই শুনি বলে ঘোষণা করেছে এবং বুন যে একটা জঘন্য অন্যায় অপরাধ তা সে প্রমাণ করেছে সাইবেরিয়ায় কয়েক বছর সশ্রম কারাদণ্ডভোগ করে।

বিচারকদের ভাষায়- Raskolnikov was not quite the same as the ordinary sort of murderer , bandit and robber , but was somehow in a different category .

রাসকলনিকভ তার বোকামির জন্যে জীবনে যে দুর্যোগ বহন করে এনেছে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে বালিশের নীচে বাইবেল নিয়ে শয়ন করেছে যে বাইবেল সোনিয়া তাকে দিয়েছিল , “ the same one she had read when reading to him about the resurrection of Lazarens ”

লেখক একটি নির্দিষ্ট তত্ত্ব অনুসারে নায়ককে সৃষ্টি করেছেন তা অনেকটা কৃত্রিম হয়ে গেছে। কিন্তু যে সমস্ত চরিত্র তত্ত্বের বাইরে তারা কিন্তু অত্যন্ত জীবন্ত সহজ , স্বাভাবিক , এবং অকৃত্রিম হয়ে উঠেছে , যেমন সোনিয়া , দুনিয়া , রাজুমুখীন প্রভৃতি।

সোনিয়া জীবনের সব দুঃখকষ্টকে অমৃতের মতো কণ্ঠে ধারণ করে নীলকণ্ঠ হয়ে গেছে। সংসারের অভাব তাকে দেহ বিলাসিনী করেছে তাতে তার অন্তরের গুচিতা বিনষ্ট হয়নি। কোনো অভিযোগ নেই তার কারও বিরুদ্ধে। বাইবেল তার জীবনে ধ্রুবতারা। তাই সে আত্মত্যাগে হয়েছে স্মরণীয়।

উপন্যাসের আরেকটি অন্যতম প্রধান চরিত্র রাসকলনিকবের বোন দুনিয়া। দুনিয়া এক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন নারী যে ধনীর ধন দৌলতের লোভের কাছে আত্মবিসর্জন করেনি। সিডরিগাইলভ ছিল ধনী। সে দুনিয়াকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু দুনিয়া সংসারের অভাবের কুণ্ডের মধ্যে বাস করেও ধনীর ধন ও দৌলতের হাতছানিকে উপেক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। তার নৈতিক শিক্ষা তাকে বাধা দিয়েছে ধনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে। সে সিডরিগাইলভের ক্ষুধার্ত কামনার নৃশংস আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে কেবলমাত্র নৈতিক শক্তিতে নির্ভর করে। দুনিয়া এই মহৎ পরীক্ষায় হয়েছে বিজয়িনী। আর তাই রাজমুখীন এর মতো এক অকৃত্রিম দরদী মানুষকেই সে জীবনের সঙ্গীরূপে লাভ করে ধন্য হয়েছে।

Leave a Comment