You are currently viewing লে মিজারেবল : একজন বদলে যাওয়া মানুষের অসাধারণ গল্প

লে মিজারেবল : একজন বদলে যাওয়া মানুষের অসাধারণ গল্প

ফরাসি সাহিত্যের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ভিক্টর হুগোর ‘লে মিজারেবল’ উপন্যাসের মাধ্যমে। আমি এরপর আলেকজান্ডার দ্যুমা, আলবার্ট কামুস, জ্যাঁ পল সাত্রে,জুল ভার্ন কিংবা ভলতেয়ার মতো অনেক বিখ্যাত ফরাসি লেখকদের সাহিত্য অল্প বিস্তর পড়েছি। তবে ভিক্টর হুগোর এই উপন্যাস আমার কৈশোরে আমার হৃদয়ে দাগ কেটে ছিল। এখনো আমকে কেউ আমার প্রিয় কিছু উপন্যাসের নাম বলতে বললে আমি সেই তালিকায় ‘লে মিজারেবল’ এর নাম অবশ্যই রাখবো।

উপন্যাসটি ফরাসি বিপ্লবের আগের ও পরের সময়কার প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। সেই সাথে ভিক্টর হুগো দেখিয়েছেন সেই সময়কার ফরাসি সমাজের রূহ বাস্তবতার দৃশ্য। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ‘জাঁ ভালজাঁ’। ছোট বেলায় নিজের পিতা মাতাকে হারিয়ে জাঁ ভালজাঁ নিজের বড় বোনের অভাবের সংসারে মানুষ হন। কিন্তু তার বোনের স্বামীর হঠাৎ মৃত্যু হলে,তার বোনের ৭ সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মাত্র ২৫ বছর বয়সী জাঁ ভালজাঁ। কিন্তু কাজের অভাবে সে তার বোনের সন্তানদের মুখে ঠিকমত খাবার তুলে দিতে পারছিল না। কয়েকদিনের অভাবে যখন শিশুগুলো প্রায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পরছিল, জাঁ ভালজাঁ তখন বাধ্য হয়ে একটি রুটির দোকান থেকে রুটি চুরি করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু দুর্ভাগা জাঁ ভালজাঁ রুটি চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে যান।

ভিক্টর হুগো Image Courtesy: Britnica



সেই সময়ের ফরাসি সমাজের বিচার ব্যাবস্থা ছিল ‘লঘু পাপে গুরু দণ্ড’ এর মতো। রুটি চুরির অপরাধে জাঁ ভালজাঁকে ৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু বার বার কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়ে সেই সাজা বাড়তে বাড়তে ১৯ বছর গিয়ে শেষ হয়। কারাগার থেকে জাঁ ভালজাঁ যখন মুক্তি  পান তখন তিনি প্রায় মাঝবয়সী এক পৌঢ়। দৈহিক আকারে সে এক বিশাল আকারের মানব,মুখশ্রী কদাকার। প্রথম দর্শনে যে কেউ ধারণা করে নিবে এই লোক নিশ্চয়ই কোনো জেল পালানো আসামি। আর সে কারনে সে আশ্রয় পাবার কোনো জায়গাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

সব জায়গায় প্রত্যাখ্যান হয়ে সবশেষে জাঁ ভালজাঁ আশ্রয় পান বিশপ মিরিয়েলের কাছে। বিশপ মিরিয়েলের মহানুভবতা জাঁ ভালজাঁ এর জীবনকে পুরোপুরি পরিবর্তন করে দেয়। তার উপদেশ ও মহানুভবতা জাঁ ভালজাঁ এর জীবনে নতুন এক প্রদীপ জ্বেলে দেয়। বিশপ মিরিয়েরল দেওয়া আর্থিক সহায়তা পেয়ে জাঁ ভালজাঁ নতুন এক শহরে গিয়ে গয়না ও অলংকারের ব্যাবসা করে অনেক টাকা পয়সার মালিক হন। সেই সাথে তিনি গরিব ও অসহায় মানুষদের অনেক সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তার এই মহানুভবতার জন্য জাঁ ভালজাঁ শহরের সকলের কাছে অনেক জনপ্রিয় হয়ে যান। একসময় তিনি ফ্রান্সের রাজার অনুরোধে শহরের মেয়রের দায়িত্ব নেন। কিন্তু জাঁ ভালজাঁ তার কারাগারের পুলিশ জ্যাভার চোখে ধরা পড়ে যান। মন্ট্রেই শরের মেয়র মঁসিয়ে মাদেলেন আসলে একজন জেল খাটা দাগি আসামি জাঁ ভালজাঁ। জাঁ ভালজাঁ একপ্রকার বাধ্য হয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। পালিয়ে গিয়ে জাঁ ভালজাঁ আরেক হতভাগী ফাতিনের কন্যার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। এরপর জাঁ ভালজাঁ ও ফাতিনের কন্যা কজেত কে নিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে পালিয়ে বেড়িয়েছেন পুলিশ ইন্সপেক্টর জাঁভের এর হাত থেকে বাঁচার জন্য। পুলিশের সাথে এমনই এক নাটকীয় ধাওয়ার পর জাঁ ভালজাঁ এক কনভেন্টে আশ্রয় পায়। ফশলভাঁ নামের এক বৃদ্ধ ব্যক্তি তাদের সাহায্য করে, যার জীবন জাঁ ভালজাঁ আগে বাঁচিয়েছিল। তার সাহায্যে ভালজাঁ সেখানে মালী হিসেবে কাজ নেয় এবং কোজেতকে শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি করায়। তারা কয়েক বছর সেই কনভেন্টে বেশ শান্তিতেই কাটায়। কিন্তু কোজেতের চাওয়াতে সেই স্থান তাদের ত্যাগ করতে হয়। কোজেতের এই বন্দি জীবন আর ভালো লাগছিল না। সে বাহিরের জীবনকে দেখতে চাইছিল। এরপর জাঁ ভালজাঁ এর জীবনে আর শান্তি আসে নি। আবারো সেই পালিয়ে বেড়ানো ও পুলিশের সাথে চলা লুকুচুরি খেলা।

আরো পড়ুন:  ইলিয়াড : যুদ্ধ, বীরত্ব ও ট্রাজেডির মিশেলে হোমারের অমর এক মহাকাব্য
ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত উপন্যাস ‘লা মিজারেবল’।



ভিক্টর হুগোর এই উপন্যাসের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নাম মারিউস। মারিউস একজন তরুণ আইনের ছাত্র। মারিউস তার দাদা মঁসিয়ে গিলেনরমঁ-এর কাছে বড় হন, যিনি একজন রাজতন্ত্রের সমর্থক। কিন্তু তার বাবা, জর্জ পঁমেরসি, ছিলেন নেপোলিয়নের সৈনিক। দাদার প্রভাবে মারিউস ছোটবেলায় বাবাকে ভুল বুঝতেন। পরে যখন তিনি জানতে পারেন তার বাবা তাকে কত ভালোবাসতেন, তখন তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। শুরুতে তিনি রাজতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। পরে বাবার সত্য জানার পর তিনি নেপোলিয়ন ও গণতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি প্যারিসের ল্যাটিন কোয়ার্টারে গিয়ে বিপ্লবী ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হন।

দাদার বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে তিনি অর্থকষ্টে পড়েন। খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন, ছোটখাটো কাজ করে নিজের খরচ চালান। একদিকে রাজনৈতিক চিন্তা, অন্যদিকে ব্যক্তিগত সংগ্রাম—দুটোই তাকে পরিণত করে। এরই মাঝে একদিন লুক্সেমবার্গ গার্ডেনে সে এক সুন্দরী মেয়েকে প্রথমবারের দেখায় তার প্রেমে পড়ে, সে হলো কোজেত। কিন্তু লাজুক স্বভাবের কারণে সে তার প্রেম প্রকাশ করতে পারে না। পরে নানা ঘটনার মাধ্যমে তারা আবার মিলিত হয় এবং একে অপরকে ভালোবাসার কথা জানায়।

এই সময় প্যারিসে বিদ্রোহ শুরু হয়। মারিউস ব্যারিকেডে যোগ দেয়। জাঁ ভালজাঁর সেখানে যায়, মূলত মারিউসকে রক্ষা করতে। সেই বিদ্রোহে জাঁ ভালজাঁর ইন্সপেক্টর জাভেরকে হত্যা করার সুযোগ পেয়েও তা না করে তাকে মুক্ত করে দেয়। পরে গুরুতর আহত মারিউসকে নিয়ে প্যারিসের নর্দমার পথ দিয়ে পালায়। জাভের তাকে ধরলেও পরে ছেড়ে দেয়, কিন্তু নিজের কর্তব্যভঙ্গের জন্য আত্মহত্যা করে। ইন্সপেক্টর জাভের এর কাছে পৃথিবীর সকল মানুষ ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। সাধারণ জনগণ ও অপরাধী। সে মন থেকে বিশ্বাস করত একজন অপরাধী কখনো ভালো হতে পারে না। কিন্তু জাঁ ভালজাঁর মহানুভবতা তার সেই বিশ্বাস কে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। আর সেই কারণেই নিজের বিশ্বাস ও আদর্শের মৃত্যু ঘটায় সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।

মারিউস সুস্থ হয়ে ওঠে এবং কোজেতকে বিয়ে করে। কিন্তু এই বিয়ে জাঁ ভালজাঁর জীবনে আঘাত হানে। নিজের অতীত জানার পর মারিউস ধীরে ধীরে কোজেতকে ভালজাঁ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। আর এর ফলে জাঁ ভালজাঁর আর একাকী ও নিঃসঙ্গ জীবন আর সহ্য করতে না পেরে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু শেষে জাঁ ভালজাঁর এর ঘোরতর শত্রু থেনার্দিয়ের অনিচ্ছাকৃতভাবে সত্য প্রকাশ করলে মারিউস জানতে পারে জাঁ ভালজাঁই তার জীবন রক্ষা করেছিল। মারিউস জানতে পারেন জাঁ ভালজাঁই মন্ট্রেই এর মেয়র মঁসিয়ে মাদেলেন। আর কোজেতের বিয়েতে জাঁ ভালজাঁ এর দেওয়া ছয় লক্ষ ফ্রা কোনো চুরি বা ডাকাতির করা সম্পদ নয়। সেটি জাঁ ভালজাঁ কষ্টের পরিশ্রমে গড়া। উপন্যাসের সমাপ্তি হয় জাঁ ভালজাঁর এর মৃত্যু এর মাধ্যমে। মারিউস ও কোজেতের উপস্থিতিতে এক আবেগময় দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। যা যেকোনো পাঠকের চোখে তা জল আনতে বাধ্য। এভাবেই শেষ হয় সারা জীবন দুঃখ,কষ্ট ও লাঞ্ছনায় জীবন কাটানো জাঁ ভালজাঁর এর চীর দুঃখী জীবনের।

Author

  • শৈশব থেকেই ইতিহাস, মিথলজি আর শিল্পের অলিগলি আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হতো। ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা সেই বিস্ময়কে পরিণত করেছে ভালোবাসায়। আমি মনে করি, জগতকে বোঝার সেরা উপায় হলো পাঠ করা আর নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করার সেরা মাধ্যম হলো লেখা। তাই কেবল জানানোর জন্য নয়, বরং লিখতে ভালোবাসি বলেই আমার এই শব্দযাত্রা। নতুনের সন্ধানে বিরামহীন ছুটে চলা আর সেই অভিজ্ঞতার নির্যাসটুকুই আমি এখানে ভাগ করে নিই।

    লেখক ও সম্পাদক, মুখোশ.নেট

    View all posts