জন কীটস: আস্তাবল থেকে ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের শ্রেষ্ঠ কবি

জন কীটস এর জন্ম লন্ডনে, তাও আবার সোয়ান ও হুপইন আস্তাবলের মধ্যে। কীটসের বাবা টমাস কীটস ছিলেন প্রথমে ভাড়াটে ঘোড়ার আস্তাবলের কর্মচারী, পরে সেই আস্তাবলের মালিকের কন্যা জেনিংসকে বিবাহ করে সেই ব্যবসায়ের মালিক হয়ে যান। কীটস রা চার ভাই , এক বোন। একভাই শৈশবে মারা যায়। কীটসের বাবার আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল এবং অবস্থাপন্নই ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে ছেলেদের লেখাপড়ার জন্য তাদেরকে হ্যারোতে পাঠাবেন কিন্তু তা হলো না। এনফিল্ড – এর একটা নামকরা স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করে দিলেন। এখানে প্রধান শিক্ষকের ছেলে চার্লস কাউনডেন ক্লার্ক এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে। কাউনডেন ক্লার্ক ছিলেন একজন পণ্ডিত ব্যক্তি এবং সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি কীটসের মনে কবি কল্পনা বা কাব্য রচনা ও আস্বাদনের প্রেরণা জুগিয়ে দেন।

ছোটোবেলায় অবশ্য কীটসের পড়াশুনায় মন ছিল না। কেবল মারপিট আর মারামারিতে তাঁর উৎসাহ ছিল। কিন্তু স্কুলে এসে কাউডেন ক্লার্ক – এর সান্নিধ্যে তিনি এলিজাবেথীয় কবি স্পেন্সার ও নাট্যকার শেক্সপিয়রের কাব্য ও নাটকের সঙ্গে পরিচয় লাভ করেন। চ্যাপম্যান অনূদিত হোমারের ইলিয়াড এর সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটে। ১৮০৪ সালে কীটসের বাবা মারা যান। মা দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিবাহ সুখের না হওয়ায় তিনি বাবার বাড়ি ফেরত আসেন। ১৮১০ সালে তিনি ক্ষয়রোগে মারা যান। কীটসের বয়স তখন মাত্র ১৪!

মায়ের মৃত্যুর পর কীটস – এর দিদিমা কীটস কে স্কুল ছাড়িয়ে একজন চিকিৎসকের অধীনে শিক্ষানবিশের কাজে নিযুক্ত করে দেন। কিন্তু কীটস কিছুদিন পরে ডাক্তার ড্যামণ্ডের সঙ্গে ঝগড়া করে শিক্ষানবিশি ছেড়ে দিয়ে ১৮১৪ সালে লন্ডন চলে আসেন। এখানে সেন্ট টমাস হাসপাতালে বেশ কিছুদিন ধরে হাতে কলমে ডাক্তারি বিদ্যা শিখলেন। কিন্তু কীটসের জন্য এসব নয়। তার ভাবুক মন তখন ছুটে চলেছে কাব্যের মায়াময় জগতে।

১৮১৭ সালে ওসব ছেড়ে দিয়ে কাব্যের জগতে পুরোপুরি আত্মনিমগ্ন হলেন। এ সময়ে তিনি যাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন তারা হলেন কবি জন হ্যামিলটন রেনল্ড, চিত্রশিল্পী সেভার্ন, সমালোচক হ্যাজলিট, কোলরীজ, ল্যাম্ব,শেলী।

কীটস – এর জীবনে প্রথম আঘাত এল যখন মেজভাই জর্জ কীটস আমেরিকা চলে গেল এবং ছোটোভাই টম কীটস ক্ষয়রোগে মারা গেল। কীটসের জীবনে তখন কেবল শুধুই শূন্যতা। তখন তিনি এক সাধারণ মেয়ে ফ্যানী ব্রনীর প্রেমে পড়লেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ক্ষয়রোগে তাঁকেও আক্রমণ করেছে, ফলে কীটসের জীবনে প্রেমের মাধুর্য অপেক্ষা যান্ত্রণাই বৃদ্ধি পেল। বন্ধুরা তাঁকে নিয়ে এলেন স্বাস্থ্য পরিবর্তনের জন্য ইতালিতে। কোনো সুরাহা হলো না। ১৮২১ সালে ২৮ শে ফেব্রুয়ারি মাসে ২৫ বছর বয়সে কীটস ইহলোক ত্যাগ করে চলে গেলেন। রোমের প্রোটেস্টান্ট সমাধিভূমিতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর স্বরচিত বাণী লেখা হলো সমাধিভূমির উপর

আরো পড়ুন   ম্যারি অ্যান বিভান: সবচেয়ে কুদর্শন নারী নাকি সবচেয়ে অসাধারণ মা?

“এখানে এমন একজন শায়িত , যার নাম বারি ধারায় লেখা হয়েছিল।”

কীটসের রচনা

কীটসের প্রথম রচনা “ ইমিটেশন অব স্পেন্সার ” ( ১৮১৩ ) আঠারো বছর বয়সে রচিত । ১৮১৭ সালে তাঁর কবিতার প্রথম খণ্ড আত্মপ্রকাশ করে। খণ্ডটির নাম “ পোয়েমস ”। এই গ্রন্থটি লে হান্টের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত । এর কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা হলো , “ অন ফাস্ট লুকিং ইনটু চ্যাপম্যানস হোমার ” , “ স্লিপ অ্যান্ড পোয়েট্রি ” , এবং “ আই স্টুড টিপ টো আপন এ লিটল হিল ”।

জন কীটস: আস্তাবল থেকে ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
কীটস এর প্রথম রচনা ইন ইমিটেশন অব স্পেন্সার Credit: poetry house

পরবর্তী খণ্ড ১৮১৮ সালে “ এণ্ডাইসিয়ন ” নামে প্রকাশিত হয় । এই কাব্যটির কাব্যমূল্য সম্বন্ধে সমালোচকদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও কাব্যের প্রথম ছত্রটি “ A thing of beauty is a joy for ever ” ( সুন্দর বস্তু মাত্রই চিরকালে আনন্দ ) কেবলমাত্র কবি কীটসের কাব্যজীবনের মন্ত্রধ্বনি ছিল না , এর মর্মসত্য অনেক কবিকেই করেছে উদ্বোধিত , জুগিয়েছে প্রেরণা, করেছে পূজারি। ব্ল্যাকউড ম্যাগাজিন এবং কোয়াটার্লি ম্যাগাজিনের কঠিন সমালোচনার তীক্ষ্ণধার দাঁতের আঘাতেও তা বিক্ষত হয়নি । বরঞ্চ ঐ একটিমাত্র ছত্রই কালের কপোলতলে সমুজ্জ্বল হয়ে রইল । তার শেষ কাব্যখণ্ড “ লামিয়া অ্যান্ড আদার পোয়েমস প্রকাশিত হয় ১৮২০ সালে । তিন খণ্ডে তার সমগ্র রচনা প্রকাশিত হয় । শেষের খণ্ডটিতে রয়েছে কীটসের পরিণত প্রতিভার আলোকে সৃষ্ট কাব্যগুলো।

কীটসের কাব্যের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য

কীটস রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ কবি। তার আবির্ভাব রোমান্টিক যুগের মধ্যাহ্নক্ষণে। কারণ এই সময়ে ইংরেজি সাহিত্যের জলাভূমিতে রোমান্টিকতার গ্লাবন, উঠেছে তুফান। যারা এনেছেন, তাঁরা শিক্ষা – দীক্ষায় ছিলেন অনেক বেশি উচ্চে। কিন্তু কীটস কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সদর দেউড়ি পার হয়ে আসেননি। এমনকি স্কুলের গণ্ডিও পার হতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাক বা নাই থাক বিশ্বসাহিত্যের দরবারে আসন প্রতিষ্ঠা করে নেবার মতো ক্ষমতা তাঁর ছিল। তাঁর জানার আগ্রহে যেমন ত্রুটি ছিল না, তেমনি ছিল না আয়োজনের। তিনি স্পেন্সারের কাব্যের গরীরাজ্যের স্বপ্নলোকেও উষাও হয়েছেন, চ্যাপম্যান রচিত হোমারের ইলিয়াড কাব্যের প্রাচীন ও অতীত যুগে যাত্রা করেছেন, তিনি মিলটনের মহাকাব্যের জগতে বিচরণ করেছেন। আকণ্ঠ ভরে পান করেছেন শেক্সপিয়রের সৌন্দর্যসুধাকে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের নির্জন প্রকৃতিলোকে তিনি অভিসার করেছেন। সবশেষে লে হান্টের প্রভাব থেকেও তিনি মুক্ত নন। সুতরাং মাত্র পাঁচ বছরের সীমিতকালের মধ্যে কবি যে ফসল তুললেন এবং কাব্যের যে রূপমূর্তি রচনা করলেন তা যেন স্পেন্সার, হোমার, শেক্সপিয়র,মিলটন, ওয়ার্ডসওয়ার্থের থেকে সংগৃহীত বিচিত্র উপাদান নিয়ে সৃষ্টি এক অপূর্ব সৌন্দর্যময় মূর্তি। সেই সঙ্গে কীটস গড়ে তুলেছিলেন নিজের মতো করে একটি ভাবসত্য। আবিষ্কার করেছিলেন জীবনের একটি নিখুঁত সত্যকে। সেখানে সংশয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব কিছুই ছিল না, ছিল বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়। তার প্রতিভার মণিদীপ দীপ্ত কক্ষে, জীবন জিজ্ঞাসার ধ্যানে গৃহে বসে যে সত্যকে জেনেছিলেন তা হচ্ছে , “ Beauty is truth Truth beautiy ” অর্থাৎ সৌন্দর্যই সত্য , সত্য সুন্দর।

আরো পড়ুন   রাজা ঈডিপাস: নিয়তি যার অভিশাপ

ফরাসি বিপ্লবের কোনো প্রভাব কীটসের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। তিনি আত্মসচেতন সমাজ – সংস্কারকও ছিলেন না। নতুন যুগের বাণীকে পাথেয় করে বিদ্রোহের রাঙা মশাল হাতে নিয়ে কাব্যে ওয়াটারলু সৃষ্টি করতে চাননি। তিনি কোনো তত্ত্ব বা দর্শন কাব্যের মধ্যে প্রচার করতে বসেননি। তিনি আসলে হলেন আত্মভাবমুগ্ধ সৌন্দর্যরস – সম্ভোগের কবি। সৌন্দর্য পিপাসাই কীটসকে মর্তমাধুরীর মহিমার প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। নিসর্গ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের পাথারে আঁখি ডুবিয়ে কবি প্রাণের পাত্রটি পূর্ণ করেছেন। প্রকৃতির সৌন্দর্যকে পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে আরতি করেছেন । সে সৌন্দর্য নিছক সৌন্দর্য , বিশুদ্ধ সৌন্দর্য। সৌন্দর্যেই তার বিকাশ , সৌন্দর্যেই তার পরিণতি। তিনি কল্পনার কল্পলোকে বসে সেই সৌন্দর্যের ধ্যান করেছেন । তাঁর কাছে কল্পনার সৌন্দর্যই হলো সত্য , বাস্তবে সে সত্যের অস্তিত্বে থাক বা না থাক। What the imagination on seizes as beauty must be the truth whether it existed or not . কবি চিরন্তন সৌন্দর্যের রূপকে ধ্যানের নয়নে দেখেছেন, সে সৌন্দর্য মৃত্যুহীন , ধ্বংসহীন। তাই কবির কল্পনার আকাশে যে নানা রঙের ছবি ভেসে ওঠে তার সৌন্দর্যই সত্য ও সুন্দর। কবির জীবনভিত্তিক সাধনা হলো সত্য ও সুন্দরের সাধনা , যা কল্পনার বরণে রঞ্জিত। কীটসের এই সৌন্দর্য – সম্ভোগকে বলা যেতে পারে Disinterested love of beauty . প্রকৃতির রূপ , রস , গন্ধ , ও বর্ণের বিচিত্র সমারোহের মধ্যে শিশুসুলভ উলঙ্গ দৃষ্টি তটস্থ , সমাহিত।

Leave a Comment