চীনা সভ্যতা মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের শাসন ও শোষণের শিকার হলেও চীন কখনো পুরোপুরি কারো অধীনস্থ হয় নি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয় চীনে ২ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চীন রাজতন্ত্রের অধিনে পরিচালিত হওয়া। চীন ছিল বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত আর সেগুলো শাসন করত স্থানীয় রাজারা। সেই সাথে চীনের ছিল বিশার জনসংখ্যার সাথে শক্তিশালী সেনাবাহিনী আর খুব সুসংগঠিত আমলাতন্ত্র।
বাণিজ্যের জন্য চীন ছিল ইউরোপ ও আমেরিকানদের জন্য বিশাল এক সম্ভাবনার সুযোগ। ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি, জাপান সবাই তখন চীনে বাণিজ্য করার সুবিধা চাইত। তবে এদের কেউই চায়নি চিনকে আক্রমণ করে দখল করে নিজেরদের মতো করে শাসন ব্যাবস্থা কায়েম করতে; যেমনটা তারা ভারতীয় উপমহাদেশ, আফ্রিকা ও আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে করতো। তাদের একমাত্র চাওয়া ছিল চীন যেন তাদের এই বিশাল জনসংখ্যার বাজারকে বিদেশীদের ব্যবসা করার জন্য মুক্ত করে দেয়। চীন তখন শাসন করত চিং (Qing) রাজবংশ; এই রাজবংশ চিনকে প্রায় ২৫০ বছর ধরে সুন্দর নিয়মতান্ত্রিকভাবে শাসন করে আসছে। চিনারা বিদেশিদের তেমন বিশ্বাস করত না। বিদেশি ব্যবসায়ী আর কূটনীতিকদের অনেক অনুনয়ের পর চিনের সম্রাট বিদেশিদের জন্য শুধুমাত্র ক্যান্টন বন্দরে খুলে দিয়েছিল। সেটাও তারা কিছু চীনা ব্যবসায়ীর মাধ্যমে। বন্দরের ব্যবসায়িক আইন ও শর্ত সবকিছুই চীনারা ঠিক করে দিত। ব্রিটিশ বণিকেরা চীন থেকে মূলত চা, চিনি, রেশম ও চীনামাটির বাসনজিনিসপত্র আমদানি করত, কারণ ইউরোপের বাজারে এইসকল জিনিসের চাহিদা ছিল অনেক বেশি। বিপরীতে চীনারা কিছুই ক্রয় করত না ব্রিটিশ বণিকদের কাছ থেকে। যেহেতু চীন ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ তাই তারা তাদের পণ্যের বিনিময়ে ব্রিটিশদের কাছ থেকে সিলভার কয়েন দাবি করত; যেহেতু চীনে সিলভার খুব একটা সহজলভ্য ছিল না। ব্রিটিশদের চীনারা বলত, “আমরা তোমাদের পণ্য চাই না, শুধু রুপা দাও।” আর এই অসম বাণিজ্যের ফলে ব্রিটিশদের সকল অর্থ চলে যাচ্ছিল চিনাদের হাতে।
অসম এই বাণিজ্যে ফলে ব্রিটিশরা বাধ্য হয়ে চিনাদের উপরে এক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়; যা ইতিহাসে নাম পায় ‘আফিমের যুদ্ধ’ নামে। আফিম যুদ্ধ হয়ে ছিল মোট দুইবার ; প্রথম আফিম যুদ্ধ ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ পর্যন্ত চীন ও ব্রিটেনের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। আর দ্বিতীয় আফিমের যুদ্ধটি ১৮৫৬ থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত চীনের বিরুদ্ধে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। এই দুই যুদ্ধের পরাজয়ের ফলে পরের এক শতাব্দী ইউরোপের দেশগুলোর থেকে অনেক পিছিয়ে গিয়েছিল। এই এক শতাব্দীতে চীনে বিজ্ঞান,শিল্প কিংবা সাহিত্য কোন ক্ষেত্রেই বিশেষ উন্নতি লাভ করে নি। পুরো এক শতাব্দী ধরে চীনের জনগণ আফিমের নেশায় বুদ হয়ে ছিল। চীনারা তাদের ইতিহাসের এই সময়কে বলেন ‘সেঞ্চুরি অব হিউমিলেশন’ বা ‘শতাব্দির লজ্জা’ নামে। নেশার এই দ্রব্য কিভাবে যুদ্ধের কারণ হয়ে উঠল আর পুরো চীনা জাতিকে তা রাতারাতি একটি মাদকাসক্ত জাতিতে পরিণত করল?
যুদ্ধে যাবার আগে আমদের আরেকটু পেছনে সময়ে যেতে হবে। সময়টা ১৮ শতকের শেষের দিকে, ব্রিটিশ বণিকেরা চিনাদের থেকে চা,রেশম আর চিনামাটির পণ্যের মতো আরো অনেক পণ্য আমদানি করার ফলে ব্রিটেন থেকে প্রচুর পরিমাণে রুপার মুদ্রা চীনে চলে যাচ্ছিল। ফলে ব্রিটিশ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। যেহেতু চীনারা ব্রিটিশদের কাছ থেকে কোনো পণ্যই আমদানি করছে না; তাই ব্রিটিশরা ভাবল, “চীন যদি আমাদের জিনিস না চায়, তাহলে এমন জিনিস ওদের দিব যা ওরা না চাইলেও চাইবে।” আর শুধুমাত্র একটি মাত্র বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থাকায় তাদের ব্যবসা করে লোকসান হচ্ছিল। আর এই লোকসান থেকে নিজেদের বাঁচাতে ব্রিটিশ বণিকেরা হয়ে উঠে ভয়ানক মাদক ব্যবসায়ী।
সেসময় ভারতবর্ষের বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা ছিল পুরোপুরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে। ব্রিটিশ কোম্পানি ও বণিকেরা এই অঞ্চলের কৃষকদের ফসল চাষ করার বদলে, তাদের উর্বর মাটিতে পপি চাষ করতে বাধ্য করত। এই পপির বীজ থেকেই তৈরি করা হতো আফিম; যা মরফিন এবং হেরোইন-এর প্রধান উপকরণ। পপি ফলের ভেতর থেকে বের হওয়া দুধের আঠালো তরল শুকিয়ে গেলে তা আফিমে পরিণত হয়। বাংলার কৃষকের প্রথমে ঋণের ফাঁদে ফেলে চুক্তি করে পপি চাষ করাতো। এমনকি তারা স্থানীয় জমিদারদের দ্বারা তাদের প্রজাদের উপর চাপ প্রয়োগ করতো পপি চাষ করানোর জন্য। আফিম চাষের ব্যবসা কতটা রমরমা ছিল; তা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আয় দেখলেই অনুমান করা যায়। ভূমি করের পর, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বিতীয় বৃহৎ রাজস্ব আসতো আফিম চাষ থেকে। ১৭৯৭ সালের মধ্যেই, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতি বছর ৪,০০০টি আফিমের বাক্স (প্রত্যেকটির ওজন ছিল ৭৭ কেজি) ব্রিটিশ বণিকদের কাছে বিক্রি করত।

আফিম চাষ করার সকল ব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেলেও সমস্যা দেখা দিল চীনে তা বিক্রি করতে গিয়ে। চীনের সরকারের কঠিন সব নিয়মনীতি মেনে আফিম বিক্রি করা ছিল অনেক কঠিন এক কাজ। ফলে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা দুরনিতিগ্রস্থ আমলা ও চীনা চোরাকারবারির সাহায্যে সারা চীনে আফিম ছড়িয়ে দেয়। সময়ের সাথে সাথে এই আফিমে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সৈনিক সকলেই এই মাদকে আসক্ত হয়ে পরে। আফিমের ভয়ানক প্রভাব ও তার অপকারিতা বুঝতে পেরে চীনা সরকার কঠোর আইন জারি করে আফিম বিক্রি ও সেবন নিষিদ্ধ করে দেন। ১৭৯৭ সালের মধ্যে, শুধু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই, প্রতি বছর ৪,০০০ টি আফিমের বাক্স (প্রত্যেকটির ওজন ছিল ৭৭ কেজি) ব্রিটিশ বণিকদের কাছে বিক্রি করত।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে, ১৭২৯ সালে চীনে বছরে মাত্র ২০০ বাক্স আফিম রপ্তানি করা হতো। ১৭৬৭ সাল নাগাদ তা ১,০০০ হাজার বাক্সে পৌঁছে যায়। আর প্রথম আফিম যুদ্ধের (১৮৩৯-৪২) আগে ১৮২০-১৮৩০ এর এক দশকে প্রতিবছর ১০ হাজার বাক্স আফিম বিক্রি করতো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৮৩৮ সাল নাগাদ যা ৪০ হাজার বাক্সে পৌঁছায়।
আগে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা নিজের পকেটের পুরো পয়সা খরচা করে চীন থেকে চা,রেশম ও চিনামাটির জিনিসপত্র কিনতে হতো। আফিম চোরাকারবারিদের মাধ্যমে পুরো চীনে ছড়িয়ে দেয়ার ফলে চিনের বিশাল পরিমাণ রৌপ্যের মুদ্রা চলে আসে ব্রিটিশ বণিকদের হাতে। তারা শুধু আফিম বিক্রির লাভের টাকা দিয়েই চীন থেকে নিজেদের ব্যবসার পণ্যসামগ্রী আমদানি করে ফেলতেন। একেতো ব্রিটিশ বণিকেরা বিশাল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পুরো চীনে আফিম ব্যবসা করে দেশের সকল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে; অপরদিকে চীনের বিশাল কর্মক্ষম মানুষ এই আফিমের নেশায় আসক্ত হয়ে নিজেদের সর্বনাশ করে চলেছে। ফলাফল স্বরূপ মারাত্মক আকার ধারণ করে সামাজিক অনাচার। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক পর্যায়ে চলে যায়, যে চিনের রাজা ক্ষুদ্ধ হয়ে এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেন।

ক্ষুব্ধ চীনা রাজা আদেশে দেন, যেনো চীনের সকল প্রকার আফিম ধ্বংস করে দেয়া হয়। রাজার আদেশ পেয়েই কেন্তন বন্দরে ব্রিটিশদের প্রায় ১.২ মিলিয়ন কেজি আফিম চীনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাগরে ডুবিয়ে নষ্ট করে দেয়। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ বণিকেরা চীনা রাজশক্তির উপর ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশদের সাথে চীনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ব্যবসায়ীরা ব্রিটিশ সরকারকে চাপ দিতে থাকে তারা যেনো চীনের এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ব্যবসায়ীদের চাপে বাধ্য হয়েই ব্রিটিশ সরকার ১৮৩৯ সালে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই যুদ্ধ চলে ১৮৩৯ সাল থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত; যাকে বলা হয় ইতিহাসের ‘প্রথম আফিম যুদ্ধ’। স্বাভাবিক ভাবেই যুদ্ধে চীনারা হেরে যায়। একেতো ব্রিটিশ নৌবাহিনী তখন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী। আর অপরদিকে চীনা বাহিনী ছিল আফিমে আসক্ত এক দুর্বল সেনাবাহিনী; তারা দাড়াতেই পারেনি ব্রিটিশ বাহিনীর সামনে। ফলে খুব সহজেই যুদ্ধে হেরে পরজয় মেনে নিতে হয়।
১৮৪২ সালের ২৯ আগস্ট ‘নানকিং চুক্তির’ মাধ্যমে প্রথম আফিম যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। যুদ্ধে হারার ফলে চীনকে ব্রিটেনের দেওয়া অনেকগুলো অসম চুক্তি করতে বাধ্য করা হয়। যুদ্ধ ও আফিম নষ্টের ক্ষতিপূরণ হিসেবে চীনের রাজাকে ২১ মিলিয়ন সিলভার কয়েনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। হংকং দ্বীপটিকে স্থায়ীভাবে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিতে হয়। সেই সাথে ক্যন্ট বন্দরের পাশাপাশি নতুন আরো ৪ টি বন্দর বাণিজ্যের জন্য খুলে দিতে বধ্য হয়; এই বন্দরগুলোকে বলা হতো ‘ট্রিটি পোর্ট’। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা চীনে কম শুল্কে ব্যবসা করার সুযোগ পায়; ফলাফল স্বরূপ চীন আর নিজের শুল্কনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এছাড়াও চীনে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকরা চীনা আইনের আওতায় না পড়ে নিজেদের আইনে বিচার পেত। এতেকরে চীনের বিচারিক স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চীনের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পরে। আর চীনের রাজতন্ত্রের মর্যাদাও ক্ষুণ্ণ হয়।
ব্রিটিশদের পর ফ্রান্স, আমেরিকা, রাশিয়াও একই ধরনের সুবিধা আদায় করে নেয়। আর এর ফলে চীন ইউরোপের উপনিবেশে পরিণত না হলেও চীন ধীরে ধীরে একটি আধা-উপনিবেশে পরিণত হয়। শুরু হয় চীনের ‘সেইঞ্চুরি অব হিউমিলেশনের’ বা ‘শতাব্দির লজ্জার’।

এতোগুলো অন্যায় চুক্তি চাপিয়ে দিলেও ব্রিটিশরা চীনে আফিম ব্যবসা বৈধ ঘোষণা করাতে পারেনি। তবে বছরের পর বছর চোরাচালানের মাধ্যমে চীনে আফিম ব্যবসা চলমান থাকে। তবে আফিম ব্যবসা চলমান থাকার ফলে আবারো নতুন একটি যুদ্ধ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করে; কারণ পুরো চীন তখন আফিমে আসক্ত হয়ে চীনের রাজকোষ তখন প্রায় পুরোপুরি খালি হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া প্রথম আফিম যুদ্ধে করা চুক্তিগুলো নিয়ে ব্রিটিশরা খুব বেশি খুশি ছিল না; তারা এই চুক্তিকে সংস্কার করে আরো বড় করতে চাইছিল। ব্রিটিশদের এই স্বার্থের সাথে নতুন করে যোগ দেয় ফ্রান্স ও আমেরিকার মতো পরাশক্তি দেশগুলো।
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশরা চুক্তিকে আরো সম্প্রসারণ করে সংশোধনের দাবি জানায় চীনের রাজশক্তির কাছে। কিন্তু চীন তখন আর কোনো প্রকার চুক্তির মধ্যে যেতে রাজি হচ্ছিল না। পরিস্থিতি আবারো উত্তপ্ত হতে শুরু করে। কিন্তু চিনকে আক্রমণ করার জন্য তো কোনো না কোনো অজুহাতের প্রয়োজন। সেই অজুহাত তারা খুব শিগ্রই পেয়েও যায়। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ‘অ্যারো’ নামের একটি জাহজ কে কেন্দ্র করে। জাহাজটি চীনা মালিকানাধীন জাহাজ ছিল; কিন্তু জাহাজটি হংকংয়ে ব্রিটিশ কোম্পানির নিকট রেজিস্টার থাকায় জাহাজে ব্রিটিশ পতাকা লাগানো ছিল। চীনের নৌবাহিনী জলদস্যু ধরতে গিয়ে ৪ জন চীনা অফিসার ৬০ জন সৈন্যসমেত ঐ জাহাজে উঠে পড়ে। চীনা কর্তৃপক্ষ জাহাজটিতে চড়াও হয়ে ১২ জন চীনা নাবিককে গ্রেপ্তার করে। জাহাজের নাবিকদের সাথে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ব্রিটিশ পতাকাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্রিটিশরা তখন দাবি করেন, ব্রিটিশ পতাকার অবমাননা করা হয়েছে।
ব্রিটিশরা চীনা সরকারের কাছে তাদের এই কাজের জন্য ক্ষমা চাইতে বলে। কিন্তু চীনা সরাকার এই প্রস্তাব সাথে সাথেই প্রত্যাখ্যান করেন। আর এর ফলাফল স্বরূপ শুরু হয় ‘দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ’, যা চলেছিল ১৮৫৬ সাল থেকে ১৮৬০ সাল পর্যন্ত। ব্রিটিশ ও ফ্রাঞ্চের যৌথ বাহিনীর কাছে চীনের পরাজয় হয়। যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে চিনকে আরো অনেকগুলো অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। নতুন চুক্তিতে চীনকে আরও ১১টি নতুন বন্দর বিদেশিদের বাণিজ্য করবার জন্য খুলে দেওয়া হয়। বিদেশি কূটনীতিকদের বেইজিংয়ে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়; এর ফলে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ আরও বেড়ে যায়। খ্রিস্টান মিশনারিদের অবাধ কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়, ফলে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকরা চীনে অবাধে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার ও সম্পত্তি কেনার অধিকার পায়।
আর যার জন্য এতো কিছু সেই আফিম বাণিজ্যকে নতুন এই চুক্তিতে বৈধ ঘোষণা করা হয়; যা ছিল চীনের সামাজিক কাঠামোর জন্য মারাত্মক এক ঝুঁকি। নতুন এই চুক্তিগুলো চীনের ‘সেঞ্চুরি অব হিউমিলেশন’ কে আরো গভীর করে দেয়।
এছাড়াও চীনকে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে আরও বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিসেবে প্রায় ৮ মিলিয়ন সিলভার কয়েন দিতে হয়। কৌলুন অঞ্চল ব্রিটেনের হাতে যায়, রাশিয়া আমুর ও উসুরি নদীর মধ্যবর্তী বিশাল এলাকা দখল করে নেয়। চীনের সার্বভৌমত্ব প্রায় ভেঙে পড়ে, আইন, বাণিজ্য, কূটনীতি—সবক্ষেত্রেই বিদেশিদের দাপট বেড়ে যায়। দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পরাজয়ের ফলে চীন মূলত একটি আধা-উপনিবেশে পরিণত হয়। যা স্থায়ী হয়েছিল পরবর্তী একশত বছর।
