দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি

দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি : বুড়ো সান্তিয়াগোর হার না মানা অদম্য সংগ্রামের গল্প

দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি বিখ্যাত মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম। ১৯৫২ সালে বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৫৩ সালে তা পুলিৎজার পুরষ্কার অর্জন করে। আর এই সাহিত্যে কর্মের সাফল্যের হাত ধরেই ১৯৫৪ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জীবন পুরোটাই ছিল হতাশায় নিমজ্জিত। তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা দিয়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি ইতালিতে রেড ক্রুসের অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে যুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধে তিনি গুরুতর আহত হন এবং দীর্ঘ সময় হাসপাতালে কাটান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়কার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি তার অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ রচনা করেন। কিন্তু উপন্যাসটি তখন খুব একটা পাঠকদের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে নি। হেমিংওয়ে ১৯৩৭ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ও স্পেনে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। স্পেন গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি রচনা করেন ‘ফর হোম দ্য বেল টুলস’। এই উপন্যাসটি পুলিৎজার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলে তিনি খ্যাতি পেতে শুরু করেন।

মার্কিন সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে Image Courtesy: Wikimedia



হেমিংওয়ের ব্যক্তিগত জীবন ছিল তার ‘ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ উপন্যাসের বুড়ো সান্তিয়াগোর মতোই হতাশার বৃত্তে বন্দি। তিনি তার জীবনে চারটি বিবাহ করেছিলেন। কিন্তু কোনো সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। পুরো জীবনটাই কেটেছে প্রেম, বিচ্ছেদ আর পারিবারিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি মানসিক অবসাদে ক্লান্ত হয়ে নিজের পাখি শিকারে বন্দুকটি দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। যে মানুষটি তার পাঠকদের বুড়ো সান্তিয়াগোর মতো করে কখনো হাল না ছাড়তে শিখিয়েছিলেন; সেই মানুষটিই শেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি উপন্যাসে তিনি তা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার ব্যবহার করেছেন। ১৯৪০ স্পেন থেকে হেমিংওয়ে চলে আসেন কিউবাতে। কিউবার রাজধানী হাভানা থেকে খানিকটা দূরেই একটা বাগানবাড়ি কিনেছিলেন হেমিংওয়ে। কিউবায় তিনি তার জীবনের প্রায় ২০ বছর কাটিয়েছিলেন। উত্তাল সমুদ্রে মাছ শিকার করতে দারুণ পছন্দ করতেন হেমিংওয়ে। কিউবায় দীর্ঘদিনের বসবাসের অভিজ্ঞতা, উত্তাল সমুদ্রে মাছ ধরা। আর কিউবার জেলেদের কাটানো সময় তাকে তার বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ‘দ্য ওল্ড ম্যন এন্ড দ্য সি’ লিখবার রসদ যুগিয়েছিল। উপন্যাসে তার সমুদ্রের বর্ণনা, স্রোতের গতি, মাছ ধরার কৌশল, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা জেলেদের জীবনযাপন সবকিছুতেই তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। আর এই কারণেরই উপন্যাসে মার্লিনের সঙ্গে সান্তিয়াগোর দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রাম এত বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।

তবে উপন্যাসের মূল গল্পটি হ্যামিংওয়ে নিয়েছিলেন একটি সত্যি ঘটনা থেকে। ১৯৩৬ সালে হেমিংওয়ে ‘এস্কুইরি’ পত্রিকায় একটি  বাস্তব ঘটনার কথা লেখেন। ঘটনাটি ছিল কিউবার এক বৃদ্ধ জেলে বিশাল সাইজের একটি মার্লিন মাছ ধরেছিল। কিন্তু মাছটি নৌকার পাশে বেঁধে ফিরতে গিয়ে হাঙরের আক্রমণে প্রায় পুরো মাছ হারিয়ে ফেলেন। শেষে শুধুমাত্র মাছের কাটা আর মাথাটি পড়ে ছিল। এই ঘটনাই পরে ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ উপন্যাসের কাহিনীর মূল ভিত্তি হয়ে উঠে।

উপন্যাসের সান্তিয়াগো জেলের চরিত্রটিকে একাধিক কিউবান জেলেদের চরিত্রের মিশ্রণ মনে করা হয়। যাদের সাথে হ্যামিংওয়ে বাস্তব পরিচয় ঘটেছিল। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল ‘জর্জিও ফুয়েন্টেস’ নামক এক কিউবান জেলের। এই লোক ছিলেন হেমিংওয়ের মাছ ধরার নৌকার ক্যাপ্টেন। তার জীবন ও অভিজ্ঞতা সান্তিয়াগো চরিত্রটিকে প্রভাবিত করেছে বলে অনেকেই মনে করেন। তবে হেমিংওয়ে নিজে কখনও বলেননি যে সান্তিয়াগো চরিত্রটি শুধুমাত্র একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অনুসরণ করে তৈরি।

‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’ উপন্যাসের ঘটনাস্থল কিউবার রাজধানী হাভানার কাছাকাছি একটি ছোট জেলেদের গ্রামের। বৃদ্ধ জেলে সান্তিয়াগো প্রতিদিন তার ছোট নৌকা নিয়ে ‘গালফ স্ট্রিম’ এর গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। বুড়ো সান্তিয়াগো দীর্ঘ ৮৪ দিন ধরে কোনো মাছ ধরতে পারেনি। আর এজন্য জেলে গ্রামের সবাই তাকে দুর্ভাগা মনে করেন। সান্তিয়াগোর সাথে একজন মাছ ধরার সঙ্গী ছিল; ছেলেটার নাম মানোলিন। দীর্ঘ ৪০ দিন কোনো মাছ ধরতে না পারায় ছেলেটির বাবা মা তাকে অন্য একটি মাছ ধরার নৌকায় পাঠিয়ে দেয়। আর সেখানে সে প্রথম সপ্তাহে ৩ টি বড় আকারের মাছ ধরতে সক্ষম হয়।

অন্য নৌকায় মাছ ধরার কাজ করলেও মানোলিন প্রতিদিন সান্তিয়াগোর সাথে দেখা করতে আসে; এবং সান্তিয়াগোকে হাতের কাজে সাহায্য করেন। তারা দুজন বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। নিঃসঙ্গ সান্তিয়াগো ছেলেটিকে দেখতেন নিজের সন্তানে মতো; আর মানোলিন ছেলেটি সান্তিয়াগোকে বাবার দৃষ্টিতে দেখে। মানোলিন আবারো সান্তিয়াগোর নৌকায় ফিরতে চাইলে সে তাকে বারণ করে। তাকে সে বলে এখন যে নৌকায় আছো সেই নৌকাতেই যেন সে থাকে। ওই নৌকাটি তার জন্য সৌভাগ্য; কারণ এই কয়েকদিনে সে ওই নৌকায় সে বেশ কয়েকটি বড় মাছ ধরেছে।  

আরনেস্ট হেমিংওয়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’



৮৫তম দিনে বুড়ো সান্তিয়াগো সিদ্ধান্ত নেয় সে এবার আগের দিনগুলোর চেয়ে আরো গভীর সমুদ্রে যাবেন। ভোরে তিনি একাই ছোট নৌকা নিয়ে সমুদ্রে রওনা দেন। দিনের শেষ দিকে একটি বিশাল মার্লিন তার টোপ গিলে ফেলে এবং ছোট নৌকাটিকে গভীর সমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আর এখান থেকেই কাহিনির মূল উত্তেজনাপূর্ণ অংশ শুরু হয়।

মাছটি এত বড় ও শক্তিশালী যে সেটি নৌকাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। সান্তিয়াগো দড়ি শক্ত করে ধরে থাকেন। শুরু হয় মানুষ ও প্রকৃতির এক অসাধারণ সংগ্রাম। টানা তিন দিন ও তিন রাত তিনি ঘুম, ক্ষুধা ও শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে মাছটির সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যান। তার হাত কেটে যায়,পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, এমনকি তার বাঁ হাতও হঠাৎ শক্ত হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেয়; তবুও তিনি হাল ছাড়েন না। এই সময় সান্তিয়াগো বারবার ভাবেন, যদি মানোলিন ছেলেটা আজকে তার সাথে থাকত! শুধু সাহায্য করার জন্য নয়, কথা বলার জন্যও। একাকীত্বে তিনি নিজের সঙ্গে কথা বলেন, আবার সমুদ্রের পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গেও কথা বলেন।

আরো পড়ুন:  ইলিয়াড : যুদ্ধ, বীরত্ব ও ট্রাজেডির মিশেলে হোমারের অমর এক মহাকাব্য


সান্তিয়াগো নিজের কষ্টের পাশাপাশি বড়শিতে আটকে থাকা মাছটার কষ্টও তিনি অনুভব করেন। তিনি মার্লিন মাছটিকে নিজের ভাইয়ের মতো মনে করেন। এই দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্যে সান্তিয়াগো মাছটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করেন। তিনি তাকে শত্রু নয়, বরং একজন মহান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবেন। গল্পের চূড়ান্ত মুহূর্তেসান্তিয়াগো মার্লিনটির হৃদয়ে হারপুন বিদ্ধ করে মাছটিকে হত্যা করেন। মাছটি মারা যাওয়ার মুহূর্তেও তার শক্তি, সৌন্দর্য ও সাহস সান্তিয়াগোর মনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে।

এই মার্লিনটি এতোটাই বিশাল আকৃতির ছিল যে নৌকার ভেতরে তা তোলা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তাই তিনি সেটিকে নৌকার পাশে বেঁধে তীরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। মার্লিনের কষ্ট শেষ হলেও সান্তিয়াগোর কষ্ট তখনও শেষ হয়নি। তীরে ফেরার পথে মার্লিনের রক্তের গন্ধে  প্রথমে একটি মাকো হাঙর আসে। সান্তিয়াগো হারপুন দিয়ে সেটিকে মেরে ফেলেন, কিন্তু হারপুনটিও হারিয়ে যায়। এরপর একের পর এক আরও হাঙর আসে। তিনি বৈঠা, ছুরি, লাঠি যা কিছুই তার কাছে ছিল; তার সব কিছু দিয়ে তিনি প্রতিরোধ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হাঙরগুলো মার্লিনের প্রায় সমস্ত মাংস খেয়ে ফেলে।  


বুড়ো সান্তিয়াগো অনেক কষ্টে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। আর ফেরার সময় তখন তার নৌকোর সঙ্গে পড়ে থাকে বিশাল মার্লিনের মাথা আর কঙ্কালটি। তিনি ক্লান্ত শরীরে নিজের কুঁড়েঘরে ফিরে গভীর ঘুমে ঢলে পড়েন। পরদিন সকালে গ্রামের জেলেরা মার্লিনের বিশাল কঙ্কাল দেখে বিস্মিত হয়ে যায়। মানোলিন তার প্রিয় শিক্ষককে দেখে কাঁদতে থাকে, কারণ সে বুঝতে পারে এই সাফল্যের জন্য কত বড় মূল্য দিতে হয়েছে। মানোলিন বৃদ্ধ সান্তিয়াগোকে ঘুমাতে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে কাঁদে এবং প্রতিজ্ঞা করে, ভবিষ্যতে সে আবার সান্তিয়াগোর সঙ্গেই মাছ ধরবে। উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে বুড়ো সান্তিয়াগো ঘুমের মধ্যে আবার আফ্রিকার সিংহদের স্বপ্ন দেখেন। এই স্বপ্ন মূলত তার হারিয়ে যাওয়া যৌবন, সাহস, আশা এবং অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক।  

এই উপন্যাসের একটি বিখ্যাত উক্তিটি ছিল ‘ বাট ম্যান ইজ নট মেইড ফর ডিফিট। ম্যান ক্যান বি ডেস্ট্রয়েড বাট নট ডিফিটেড।’  উপন্যাসে বুড়ো সান্তিয়াগো শেষ পর্যন্ত মার্লিন মাছের মাংস হারিয়ে ফেলেন। বাহ্যিকভাবে দেখলে তিনি আসলে ব্যর্থ ; তিনি বাজারে বিক্রি করার মতো কিছুই আনতে পারেননি। কিন্তু বাস্তবে তিনি পরাজিত হননি। সান্তিয়াগো সবটুকু মাছের মাংস হারিয়ে ফেললেও; নিজের মনোবল কখনো হারিয়ে ফেলেন নি। এটাই একজন ফিশারম্যানের প্রকৃত বিজয়।    

Author

  • শৈশব থেকেই ইতিহাস, মিথলজি আর শিল্পের অলিগলি আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হতো। ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা সেই বিস্ময়কে পরিণত করেছে ভালোবাসায়। আমি মনে করি, জগতকে বোঝার সেরা উপায় হলো পাঠ করা আর নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করার সেরা মাধ্যম হলো লেখা। তাই কেবল জানানোর জন্য নয়, বরং লিখতে ভালোবাসি বলেই আমার এই শব্দযাত্রা। নতুনের সন্ধানে বিরামহীন ছুটে চলা আর সেই অভিজ্ঞতার নির্যাসটুকুই আমি এখানে ভাগ করে নিই।

    লেখক ও সম্পাদক, মুখোশ.নেট

    View all posts