মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমির কবিতা: রুমির ১৫ টি বিখ্যাত কবিতা

কে দাঁড়িয়ে আমার দরজায়?

তিনি বললেন, কে দাঁড়িয়ে আছে আমার দরজায়?
আমি বললাম আপনার এক অবনমিত বান্দা।

তিনি বললেন, তুমি কি কাজে এসেছো?
আমি বললাম, আপনাকে সম্ভাষণ জানাতে, হে আমার প্রভু।

তিনি বললেন, তুমি কতদিন ভ্রমণ করতে থাকবে?
আমি বললাম, যে পর্যন্ত না আপনি আমায় থামতে বলেছেন।

তিনি বললেন, কতদিন তোমায় তুমি এ আগুনের মাঝে পুঁড়াবে?
আমি বললাম, যে পর্যন্ত না হবো আমি পবিত্র; এটি হলো আমার ভালোবাসার শপথ।

ভালোবাসার নিমিত্তে আমি করেছি বিসর্জন, আমার পদ আর আমার যত সম্পদ।

তিনি বললেন, তোমার মামলাটি যদিও তুমি করেছ উপস্থাপন; কিন্তু স্বাক্ষী তো করোনি হাজির।
আমি বললাম, আমার চোখের অশ্রুই আমার সাক্ষী; আর আমার বিবর্ণ চেহারাটিই আমার সাক্ষ্য।

তিনি বললেন, তোমার সাক্ষীর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই; আর তোমার অতি অশ্রুভেজা চোখগুলো দেখতে অক্ষম।
আমি বললাম, আপনার ন্যায় বিচারের দ্যূতিতে আমার চোখ দুটো পরিষ্কার এবং স্পষ্ট।

তিনি বললেন, তোমার চাওয়াটি তাহলে কি?
আমি বললাম, আপনায় আমি পেতে চাই; আমার অবিচল বন্ধু হিসেবে।

তিনি বললেন, আমা হতে তোমার কি প্রত্যাশা?
আমি বললাম, আপনার অপরিসীম অনুগ্রহ।

তিনি বললেন, যাত্রাপথটিতে কে ছিলো তোমার সঙ্গী?
আমি বললাম, আপনার ধ্যান; হে আমার প্রভু।

তিনি বললেন, কে তোমায় এখানে প্রলোভিত করে এনেছে?
আমি বললাম, আপনার শরাবের সুগন্ধ।

তিনি বললেন, কি বয়ে নিয়ে আসে তোমার মনে সবচাইতে পরিপূর্ণতা?
আমি বললাম, প্রভুর সান্নিধ্যে।

তিনি বললেন, তুমি সেথায় কি খুঁজে বেড়াও?
আমি বললাম, শতো বিষ্ময়কর বস্তু।

তিনি বললেন, প্রাসাদটি তাহলে এতো নির্জন কেনো?
আমি বললাম, তাঁরা সবাই চোরকে ভয় পায়।

তিনি বললেন, চোরটি তাহলে কে?
আমি বললাম, আপনার সান্নিধ্য হতে যে আমায় ভুলিয়ে রাখে।

তিনি বললেন, সেখানে কোথায় আছে নিরাপত্তা?
আমি বললাম, সেবা এবং ত্যাগের মাঝে।

তিনি বললেন, সেখানে ত্যাগ করার কি আছে?
আমি বললাম, মুক্ত হবার বাসনা।

তিনি বললেন, সেখানে কোথায় আছে বিপর্যয়?
আমি বললাম, আপনার ভালোবাসার উপস্থিতিতে।

তিনি বললেন, এ জীবন থেকে তুমি কি ফায়দা কুড়োতে পারো?
আমি বললাম, নিজের প্রতি সদা সত্য থেকে।

এখন সময় হয়েছে আমার শান্ত হওয়ার।
যদি তোমায় আমি বলি তাঁর প্রকৃত সত্তা সম্পর্কে, তুমি তখন উড়ে যাবে তোমার নিজ থেকে এবং হবে একেবারে উধাও,

আর এ দরজা কিংবা ছাদ এর কোনোটি তোমায় আর রাখতে পারবে না ধরে।

যখন আমার মৃত্যু হবে

আমার কফিন যখন নিয়ে যাবে
তুমি তখন এটা ভেবো না— আমি এ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছি!
চোখ থেকে অশ্রু ফেলো না
মুষড়ে যেও না গভীর অবসাদে কিংবা দুঃখে
আমি পড়ে যাচ্ছি না কোন অন্তর্হীন গভীর ভয়ংকর কুয়ায়!

দেখবে যখন আমার মৃতদেহ নিয়ে যাচ্ছে
তুমি কেঁদো না- আমি কোথাও যাচ্ছি না
আমি কেবল পৌঁছে যাচ্ছি অনন্ত প্রেমে।

মানুষ যখন আমাকে কবরে শোয়াবে
বিদায় বলো না আমাকে! কবর কেবল একটা পর্দা মাত্র
এটা পেরোলেই স্বর্গ।

তুমি কেবল দেখেছো আমাকে কবরে নামতে
এখন দেখো আমি জেগে উঠছি!
কিভাবে এটার শেষ হয় সেখানে
যখন সূর্য অস্তাচলে যায় কিংবা চাঁদ ডুবে?

এটা মনে হবে এখানেই শেষ
অথচ এটা অনেকটা সূর্য উঠার মত, এটা বরং সুপ্রভাত
যখনই কবর ঢেকে দেয়া হবে
ঠিক তখনই তোমার আত্মা আবার মুক্ত হবে।

তুমি কি কখনো দেখছো—
একটা বীজ মাটিতে রোপন করা হয়েছে
কিন্তু নতুনভাবে জন্মায়নি?
তাহলে তুমি কেন সন্দেহ করো!
মানুষ নামের একটা বীজ জাগবে না?

তুমি কি কখনো দেখেছো?
একটা বালতি কুয়ায় নামানো হয়েছে
অথচ এটা খালি ফিরে এসেছে?
তাহলে তুমি কেন আহাজারি করো!
একটা আত্মার জন্য

যখন এটা কুয়া থেকে উঠে আসে ইউনুসের মত!
তুমি শেষবার নৈঃশব্দে ডুববে
তোমার শব্দ ও আত্মা পৌঁছে যাবে এমন এক পৃথিবীতে
যেখানে কোন স্থান নেই, সময় বলে কিছু নেই!

প্রার্থনা

হে প্রভু আমার,
তোমার সত্যিকার প্রশংসা করাতে-
কোনো জিহ্বাই নয় সক্ষম।

তোমার ঐশ্বরিক করুনার সমুদ্রের-
নেই কোনো কিনারা।

তোমার বাস্তব অস্তিত্বের রহস্য-
কারো কাছেই নেই প্রকাশিত।

চূড়ান্ত পুনর্মিলনের সঠিক পথে চলাতে
তুমি সদা দিয়ে যেও আমাদের-
তোমার দিক নির্দেশনা।

বিচ্ছেদের রাতটি যদিও হয় তমসাবৃত,
তথাপি আমরা উৎফুল্ল,
যেহেতু তোমার সাথে-
আমাদের পুনর্মিলনের প্রভাতটি হবে-
উজ্জ্বল, আনন্দময়।

হে প্রভু আমার,
বিষাদের মৌসুমে তুমি আমার আত্মার প্রশান্তি।

আমার হৃদয়ের কঠোর মর্মবেদনায়-
তুমি আমার আত্মার প্রাচুর্য।

যখন আমার আত্মাটি হয়-
তোমার দিকে ধাবিত,
তখন তুমিই দাও তার ভেতরে-
এক অকল্পনীয়তা,
আর এক অজানাকে জানার তীব্র অনুভূতি।

হে দয়াময় প্রভু আমার
যদি আমার দেহটি হয় অপরাধী;
আমার হৃদয়টি যেনো থাকে তোমার অনুগত।

আমি যদি হই অপকর্মকারী-
তোমার ক্ষমাশীলতা যেনো হয়–
আমার সুপারিশকারী।

আমার অবনমিত হৃদয়ে শিকার করছি-
আমরা ভুল করেছি।

হে দয়াময় প্রভু
আমাদের হৃদয়ে রোপন করো-
শুধুমাত্র তোমার ভালোবাসার বীজ।

আমাদের আত্মার জন্য ধার্য করো-
শুধুই তোমার ক্ষমা-
শুধুই তোমার দয়া।

কেবল তোমার ক্ষমাশীলতা করো বর্ষণ-
তোমার সব অবনমিত বান্দার উপরে।

তুমি আমাদের চোখে মুখে দাও লজ্জার ধুলো,
কিন্তু তোমার পরিতাপ দ্বারা দিওনা-
কঠিন শাস্তি আমাদের।

মহিমাময় সৌন্দর্য

আমার জীবনের আদি হতে,
আমি তোমার মুখখানি খুঁজে ফিরেছি,
কিন্তু আজ তা আমি দেখেছি।

আজ আমি দেখেছি সে মাধুর্য, সে সৌন্দর্য, সে অগাধ দয়াময় চেহারার আভাস__
যা আমি এতোকাল খুঁজে ফিরেছি।

আজ আমি খুঁজে পেয়েছি তোমাকে-
এবং তাদেরও যারা আমায় নিয়ে হেসেছিলো-
করেছিলো আমাকে অবজ্ঞা একদিন,
তারা আজ অনুতপ্ত-
কারণ তাদের দেখার মাঝে ছিলো না সে প্রচেষ্টা-
যা ছিলো আমার মাঝে।

তোমার মহিমাময় সৌন্দর্যে আমি হয়েছি বিভ্রান্ত,
এবং ইচ্ছে আবারও তোমাকে দেখতে-
আরও একশত ভেজা চোখ দিয়ে।

হৃদয় আমার আবেগে জ্বলে উঠেছিলো
আর এ বিস্ময়কর সৌন্দর্যকে চিরতরে সন্ধান করে ফিরছিলো,
যার দেখা আজ আমি পেয়েছি।

আমি লজ্জাবোধ করি বলতে এ ভালোবাসাকে মানবিক,
আবার ভয় হয় ঈশ্বরের, বলতে একে ঐশ্বরিক।

ভোরের মৃদুমন্দ বাতাসের মতো তোমার সুগন্ধি নিঃশ্বাস এসে থেমেছে-
বাগানের এ স্নিগ্ধ নীরবতায়।

তোমার শ্বাস দিয়ে আমার ভেতরে দিয়েছ জীবন।
আমি হয়েছি তোমার সূর্যালোক আবার তোমার ছায়াও।

আমার আত্মা কেঁপে উঠেছে পরমানন্দে,
আমার স্বত্বার প্রতিটি অণুকনা হয়েছে-
তোমার ভালোবাসাতে আসক্ত।

তোমার দীপ্তিতে জ্বালিয়েছো তোমার হৃদয়ে প্রেমের আগুন,
আর জ্যোতিময় করেছো তুমি আমার পৃথিবী ও আকাশ।

আমার ভালোবাসার তীর আজ এসে বিঁধেছে তার নিশানায়।
ঐশ্বরিক কৃপায় পরিপূর্ণ একটি কুটিরের ভেতরে আমি,
আর আমার হৃদয়টি হয়েছে প্রার্থনার স্থান।

তুমি প্রশ্ন করেছিলে

তুমি প্রশ্ন করেছিলে,
“কে তুমি এবং
এমন দ্বিধাগ্রস্ত অস্তিত্ব নিয়ে,
কিভাবে তুমি পারো-
প্রেমে পড়তে?”

আমি কি করে জানবো,
আমি কে, কিংবা-
আমি কেথায়!
কি করে একটি নিঃসঙ্গ ঢেউ-
নির্দেশ করতে পারবে তার অবসৃহান-
একটি বিশাল সমুদ্রের মাঝখানে!

তুমি জানতে চেয়েছিলে,
আমি কি খুঁজে ফিরছি,
পবিত্র দীপ্তির আগে এবং পরে,
যে আলোটি-
একদিন আমিই ছিলাম।

এবং কেনো আমি বন্দী
এই দেহ নামের খাঁচায়,
অথচ দাবি করছি-
আমি একটি মুক্ত পাখি।

কিভাবে আমি জানবো,
কি করে আমি হারিয়েছিলাম,
আমার ফিরে যাওয়ার পথটি;
তবে আমি নিশ্চিত জানি,
একদিন আমি ছিলাম নির্মল,
‘ভালোবাসা’ দ্বারা আমি-
প্রলুব্ধ হবার আগ মুহূর্তটি পর্যন্ত।

আরো পড়ুন   কবি চন্দ্রাবতীর প্রেমকথা

জেগে থাকো রাতে

একটি পুরো রাত তুমি জেগে থেকে দেখো-
রাতের নিস্তব্ধতাতে বাহিত হয় ঈশ্বরের অপার অনুগ্রহ।
যদি তুমি স্রষ্টার ধ্যানে জেগে থাকতে পারো পুরো একটি রাত,
দেখবে তখন অমূল্য কিছু যেনো আসতে চাইছে তোমার কাছে।

তুমি পেতে পারো রাতের নিভৃত সূর্য হতে উষ্ণতার দোলা,
ভোরের স্নিগ্ধতা উপভোগের জন্য, চোখ দুটোকে রাখতে হবে খোলা।

চেষ্টা করে দেখো আজকের রাতটিতে, ঘুমন্ত চোখের সাথে বিরোধিতা করতে,
তোমার মাথাকে আজ ফেলোনা বিছানায়, বেহেশতি খয়রাতির জন্য থাকো প্রতিক্ষায়।

রাত হলো স্রষ্টার প্রদত্ত সব উপঢৌকনের বাহক-
নবী মোহাম্মদ (সাঃ) অলৌকিক ভ্রমণে গিয়েছিলেন মেরাজের সেই পবিত্র রাতে,
যখন তিনি ডাক শুনেছিলেন সেই মহিমান্বিত কন্ঠস্বরের,
যখন তিনি উঠে গিয়েছিলেন সাত আছমানের উপরে।

দিনের বেলা হলো উপার্জনের জন্য
আর রাত হলো কেবল ঐশ্বরিক ভালোবাসার জন্যে।
সাধারণ মানুষেরা হয় দ্রুত নিদ্রাতে নিমগ্ন,
কিন্তু প্রেমিকেরা হয় সারা রাত ঈশ্বরের সাথে কথাতে মগ্ন।

সারা রাতভর একটি কন্ঠস্বর ডাকতে থাকে তোমাকে,
মহামূল্যবান সেই সময়টি জেগে উঠতে বলে তোমাকে।

যদি তুমি হারিয়ে ফেলো তোমার সুযোগ এখন,
তবে তোমার দেহটিকে পেছনে ফেলে যাবে যখন,
তোমার আত্মাটি হবে তখন পরিতাপে ভরা,
কারন মৃত্যুর পরের জীবন হতে যাবেনা আর ফেরা।

এতোদ্রুপ

যদি কেউ তোমাট কাছে জানতে চায়, বেহেশতের হুররা দেখতে কেমন?
তোমার মুখখানা তাদের দেখিয়ে বলো;
এমন।

যদি কেউ তোমাকে চাঁদের সৌন্দর্য ব্যখ্যা করতে বলে কেমন?
ছাদের উপরে উঠে বলো,
এমন।

যদি কেউ খোঁজে একটি ফেরেশতা,
তুমি তাদের দেখতে দাও তোমার মুখাবয়ব।

যদি কেউ বলাবলি করে, কম্ভরীর খুশবো কেমন?
তোমার চুলের বেনী খুলে দিয়ে তাদের বলো;
এমন।

যদি কেউ বলে, মেঘ কিভাবে চাঁদকে করে উন্মোচন?
তোমার জামার সামনের বাঁধন একটি খুলে বলো;
এমন

যদি কেউ জানতে চায়, যীশু খ্রিষ্ট মৃতকে জীবিত করেছিল কি করে?
গভীর ভালেবাসার সাথে তাদের বলো,
এমনটি করে।

যদি কেউ জানতে চায়, ভালোবাসার জন্যে যারা প্রাণ দিলো, তাঁরা ছিলো কেমন?
তাদের আমাকে দেখিয়ে বলো,
এমন।

যদি কেউ বিনীত হয়ে জানতে চায় যে আমার উচ্চতা কেমন?
তোমার ভ্রু দু’খানা উঁচু করে দেখিয়ে বলো,
এমন।

স্রষ্টার প্রেমে মাতাল

তুমিতো হয়েছো মাতাল আর আমি অপ্রকৃতিস্থ,
কেউইতো নেই আশেপাশে যে পথ দেখিয়ে আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে পারে।

বারবার আমি তোমায় বলেছিলাম,কিছুটা কম পান করতে,দু-এক পেয়ালা কম।
আমিতো জানি, এই শহরে, কেউই নয় মিতপায়ী,
একজন হতে আরেকজন আরও মন্দ,
একজন দিশেহারা আর আরেকজন বদ্ধ উন্মাদ।

এসো হে আমার বন্ধু, পদার্পণ করো, (স্রষ্টার প্রেমে ধ্বংস হয়ে যাবার) এই পানশালায়;
নতুন আরেকটি বন্ধুর সান্নিধ্যে এসে স্বাদ নাও জীবনের অমৃত সঞ্জীবনীর।

এখানে প্রতিটি কোনায় দেখবে, স্রষ্টার ধ্যানে মগ্ন কোনো মাতাল,
আর পরিবেশক অমৃতের ভান্ড হতে, চক্কর দিতে ব্যস্ত।

আমি যখনই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম (ঠিক তখনই) আমার কাছে এলো একজন মাতাল,
স্রষ্টার (প্রেমে মাতাল), যার আভাতে স্বর্গের একশতো বাড়ি হলো আলোকিত।

দোলছে আর গড়াচ্ছেন, তিনি যেনো একটি নোঙরহীন পালের নৌকো।
আসলে তিনি হলেন, উপকূলে থেকে যাওয়া সব বিচক্ষণ ব্যক্তির ঈর্ষার পাত্র।

“আপনি কোথা থেকে এসেছেন”, আমি প্রশ্ন করলাম তাঁকে।
তিনি উপহাসের ছলে হাসলেন আর বললেন,
“এক অর্ধেক পূর্ব হতে, এক অর্ধেক পশ্চিম হতে,
এক অর্ধেক তৈরি পানি আর মাটির দ্বারা
এক অর্ধেক তৈরি হৃদয় আর আত্মা দ্বারা।
এক অর্ধেক আছে সমুদ্রের তীরে,
আর এক অর্ধেক বাস করে (সমুদ্রের গভীরে) মুক্তোর ভেতরে।”

আমি অনুনয় করলাম, “আমায় আপনি বন্ধু করে সাথে নেবেন?
আমি তো আপনার অতি নিকটের আত্মীয়।”

তিনি বললেন, আমি তো স্বজনদের চিনিনা;
অপরিচিত জনের কাছে আমি রেখে এসেছি আমার যত বিষয়সম্পত্তি।
আর প্রবেশ করেছি (স্রষ্টার অমৃত সঞ্জীবনীর) এই পানশালায়।

আর কেবল আছে এক বুক ভর্তি অনেক শব্দ,
কিন্তু এগুলোর একটিও আমি আজ আর উচ্চারণ করতে জানি না।

যদি তোমার ঘুম না আসে

আমার প্রিয় আত্মা, আজ রাতে যদি তুমি ঘুমোতে না পারো,
তবে তুমি কি মনে করো হতে পারে?
তুমি যদি রাতটি কাটিয়ে দাও এবং ভোরের সাথে মিলিয়ে দাও,
তেমার হৃদয়ের স্বার্থে,
তবে তুমি কি মনে করো হতে পারে?

সারা বিশ্ব যদি পুষ্পে আচ্ছাদিত হয়,
যা রোপন করতে তুমি করেছো অক্লান্ত পরিশ্রম,
তুমি কি মনে করো ঘটবে তাহলে?

জীবনের অমৃত যা লুক্কায়িত ছিলো এতোদিন অন্ধকারে,
তা যদি ভরে দেয় এ মরুপ্রান্তর ও শহর গুলি,
তবে তোমার কি মনে হয় ঘটতে পারে?

যদি তোমার বদান্যতা এবং ভালোবাসার দ্বারা কিছু মানুষ খোঁজে পায় নতুন জীবন,
তাহলে তোমার কি মনে হতে পারে?

যদি তুমি তোমার পুরো অমৃত সুধার ভান্ডটি ঢেলে দাও মাতালদের মাথায়,
তবে তোমার কি মনে হয় হতে পারে?

প্রিয় বন্ধু আমার যাও তাহলে
ছড়িয়ে দাও তোমার সব ভালোবাসা, তোমার শত্রুদের উপর
এবং তা যদি তাদের হৃদয় করে স্পর্শ।
তাহলে তোমার কি মনে হতে পারে?

প্রতি নিঃশ্বাসে

প্রতি নিঃশ্বাসে
তুমি যদি হও তোমার নিজের ইচ্ছেগুলোর কেন্দ্রবিন্দু,
তবে তুমি হারাবে তোমার প্রিয়র অনুগ্রহ।

কিন্তু প্রতি নিঃশ্বাসে যদি,
তুমি উপেক্ষা করে যাও তোমার নিজের সব চাহিদা,
তবে ভালোবাসার পরমানন্দ, শীঘ্রই হবে আবির্ভূত।

প্রতি নিঃশ্বাসে
তুমিই যদি হও তোমার নিজের সব ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু,
শরতের বিষন্নতা এসে, তোমায় করবে ভারাক্রান্ত।

কিন্তু প্রতি নিঃশ্বাসে যদি,
শীতের প্রকৃতির মতো, তুমি করো তোমায় পুরোপুরি প্রকাশিত,
ভেতর থেকে তখন জেগে উঠবে, বসন্তের আনন্দ।

তোমার সব অধৈর্য্যতা আসে, ধৈর্য্য অর্জন করার চাপ হতে,
সে প্রচেষ্টা ছেড়ে দাও,
আর তখনই আসবে প্রশান্তি
তোমার সমস্ত অপূর্ণ বাসনাগুলো হলো, তোমার লোভের ফলশ্রুতি,
সিদ্ধি লাভের জন্য,
ওগুলোকে দূরে ঢেলে দাও
আর তখনই সেগুলো ফিরে আসবে উপহার হিসেবে।

প্রেমের যন্ত্রণা নিয়ে প্রেমে পরো
উচ্ছ্বাসে নয়,
আর তখনই তেমার প্রিয় হবে, তোমার প্রেমে আসক্ত।

বুদ্ধিমত্তা বলে, ভালোবাসা জানে

আমায় বলতে দাও তেমায়, ভালোবাসার অনুভূতিটি কেমন!
তুমি যেনো হাঁটছো একটি জলপ্রপাতের মধ্য দিয়ে,
সেটি রক্তিম লাল
পড়ন্ত পানি যেনো রক্তের পর্দার মতো।
তুমি সংগ্রাম করে চলেছো, তার মধ্য দিয়ে পেরিয়ে যাবার জন্যে।
মাঝে মাঝে তুমি বন্ধ করছো তোমার চোখ দুটো,
বন্ধ করছো তোমার মুখ।
আর বন্ধ করে রাখছো তোমার নিঃশ্বাস।

অবশেষে তুমি যখন অন্য প্রান্তে পৌঁছালে,
তুমি দেখছো একটি ফুলের মাঠ,
তুমি শুনছো পাখির কুঞ্জন,
মৃদু ঠান্ডা হাওয়া এসে যেনো তোমার চুলগুলো নিয়ে খেলছে,
তুমি অনুভব করছো প্রজাপতির ডানা যেনো তোমার গা ছুঁয়ে যাচ্ছে।

বন্ধু আমার, সেই বাগানটিই হলো ভালেবাসা।
সুতরাং তুমিতো তাহলে এবার বুঝেছো আমরা কেন বলি,
যারা ভালোবাসার সন্ধান করে, তাদের অনেক কাজ করার রয়েছে।

আমি হেসেছিলাম, যখন শুনলাম বুদ্ধিমত্তাটি বলছে,
“শুধুমাত্র ছয়টি দিক রয়েছে,
এবং তার পরে আর কিছু নেই।
সেটিই হচ্ছে সীমারেখা।
আমাদের দৃষ্টিগেচরের ভেতর যা আছে, তার বাইরে আর কোনো সৃহান নেই।”

ভালোবাসা বললো,
„হে আমার বন্ধু, আরেকটি জায়গা রয়েছে,
এবং সেখানে আমি অনেকবার গিয়েছি।”

বুদ্ধিমত্তা দেখলো একটি বাজার,
আর অমনি, বেচাকেনা করতে শুরু করে দিলো।
ভালেবাসা দেখলো সেই একই বাজারটি
এবং সে দেখলো তার বাইরে, আরও শত বিষ্ময়কর জায়গা।

মনসুরকে মনে আছে,
সে ভালেবাসাতে ছিলো প্রত্যয়
সে গিয়ে মিম্বরে উঠে ঘোষণা দিয়েছিলো, প্রিয়ার প্রতি তাঁর ভালোবাসার।
তথাপি বিজ্ঞ লোকেরাই তাঁকে করেছিল ক্রুশবিদ্ধ।

প্রেমিদের মনে হতে পারে, তারা রয়েছে গভীর বেদনার মাঝে,
কিন্তু আসলে অন্তরে তারা উৎসবমূখর।
বিষন্ন হৃদয়ের বিজ্ঞ মানুষেরা অভ্যন্তরে সবকিছুতে নেতিবাচক।

বুধিমত্তাটি বললো,
ধ্বংসের দিকে আরেকটি পা বাড়িও না, সেটি অন্তরায় ছাড়া আর কিছুই না।”

ভালেবাসা বুদ্ধিমত্তাটিকে বলে,“ওসব অন্তরায়তো তেমার ভেতরই।
শান্ত হও এবং নির্মূল করে দাও হৃদয়ের গভীরতা হতে, জীবনের সব অন্তরায়,
যতক্ষণ না তুমি দেখো, তোমার ভেতরই সেই ফুলের মাঠটি।”

শামস্ তাবরীজ আপনি হলেন সূর্যের মতো, কথার মেঘাচ্ছন্নতার প্রতি।
আপনি যখন উদয় হোন, আপনার চেহারার জ্যোতিতে, অন্য সব সংলাপ, অদৃশ্যে মিলিয়ে যায়।

আরো পড়ুন   বিখ্যাতদের মজার ঘটনা

চলম্ত পানি

যখন তুমি কোন কাজ করো তোমার হৃদয়ের দ্বারা তাড়িত হয়ে,
তখন তোমার মনে হবে যেনো একটি নদী তোমার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেলো।
যেটি তোমার মনের ভেতরের পরমানন্দ।

আবার যখন তেমার কোন কাজ কোনভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে তুমি করো,
তখন সে অনুভূতিটি সহজেই মিলিয়ে যায় অদৃশ্যে।

তুমি কাউকেই তোমার উপর নেতৃত্ব দানের সুযোগ দিও না,
কারন পারিপার্শ্বিকতার
ওপর তাদের দৃষ্টি হতে পারে অন্ধ
কিংবা তার চেয়েও খারাপ, প্রচন্ড লোভী।

স্রষ্টার দড়িতে ধরো শক্ত করে,
তার মানে, তোমার ইচ্ছেগুলোকে দমিয়ে রাখা।

অতি স্বেচ্ছাচারিতার কারনেই মানুষকে ঢুকতে হয় কারাগারে
ফাঁদের পাখির ডানা পড়ে বাঁধা
আর মাছ ঝলসিত হয় কড়াইয়ে।

পুলিশের রাগে চলে স্বেচ্ছাচারিতা,
এবার তাহলে দেখো দৃষ্টির অগোচরে কি আছে।
তুমি যদি ত্যাগ করতে পারো, তোমার স্বার্থপরতা,
তবেই তুমি দেখবে কি করে তুমি শান্তি দিচ্ছিলে তোমার আত্মাকে।

তেমার জন্ম এবং বাস,
একটি কুয়োর কালচে পানিতে,
তুমি কি করে অনুধাবন করো সূর্যের কিরণ একটি উন্মুক্ত উঠোনে?

জেদ ধরো না যেতে সেখানে,
যেখানে তুমি মনে করো তোমার যাওয়া উচিত।
তুমি চাও সেই পথটি যা তোমায় নিয়ে যায় ঝরণার উৎস যেখানে।

তোমার অগোছালো জীবনে তখন আসবে সঙ্গতি।
সেখানে রয়েছে শূণ্যে ভাসমান বারান্দাযুক্ত একটি চলমান প্রাসাদ,
স্বচ্ছ পানির ধারা তার পাশ দিয়ে প্রবাহিত।
সর্বত্র সীমাহীন
তথাপি সবকিছু যেনো একই তাবুর ভেতর বিদ্যমান।

তোমার আকর্ষণ বেড়ে যাবে চতুর্গুণ

আমরা সবাই অতিথি হয়ে আছি এ মহাবিশ্বের ঘরে,
তবে কেন আমরা ভোরবেলা বাহিরে বেরিয়ে তাকে করিনা সম্ভাষণ?
যখন মনে হতে পারে সে কেবল জেগে উঠেছে এবং তার মেজাজটা কোমল।
তখন আমাদের কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা তার কাছে হয়তো আরো গ্রহনযোগ্য হবে।

তখন হয়তো তার আনুকূল্য পাওয়া হবে সহজ।
আর সে হয়তো তখন ভালোবাসার স্নেহে দেবে তার কোমল স্পর্শ আমাদের।

আলিঙ্গনে ধরে রাখো দু’প্রান্তের মাঝখানে,
তোমার সাধ্যে যা আছে।
তা দ্বারা হও সমৃদ্ধ।
তারপর আসবে তোমার শুভদিন,
আসবে তোমার সৌভাগ্য।
আর তোমার অঙ্গ ভঙ্গিতে আসবে আরো মাধুর্য।
তোমার আকর্ষণ তখন বেড়ে যেতে পারে বহুগুণ।
আর তা কে না চায়?

যখন রাতের আকাশ, ঝলমলে তারকায় সজ্জিত হয়,
তখন তুমি আন্তরিকতার সাথে স্রষ্টাকে জানাও ধন্যবাদ।
তোমার সন্ধ্যাটি হবে তখন আরো অনেক আকর্ষণীয়,

আকাশ থেকে প্রতিনিয়ত স্রষ্টার সব অদৃশ্য
নেয়ামত এসে পড়ছে আমাদের ওপর।
যদি তোমার অন্তর্দৃষ্টি না হয় প্রসারিত
কিংবা তোমার মুখ,
কিংবা তোমার হৃদয় যদি না হয় উন্মুক্ত
তবে কি করে তুমি তার পুরোপুরি স্বাদ নিতে সক্ষম হবে।
যখন সে নেয়ামতগুলো তোমাকে অগণিত ব্যাধি এবং অশুভ হতে রাখে মুক্ত?

ভালোবাসা হলো

ভালোবাসা হলো একটি বিশাল ঝুলন্ত সাগর,
পুরোনো গোপনতা দ্বারা পূর্ণ,
ডুবে যাওয়া হৃদয়ে পূর্ণ,
কেবল এক ফোঁটা ধরে রেখেছে কিছুটা আশা
এবং বাকি সব আতঙ্ক ছাড়া আর কিছুই না।

ভালোবাসা হলো যা মানুষকে করে প্রসন্ন।
ভালোবাসা হলো তা, যা আমাদের অস্তিত্বের সার্থকতা জাগিয়ে তোলে।
আমার জন্ম দিয়েছিলেন আমার মা যা বলি ভালোবাসা,
আমার সে মায়ের প্রতি আমার মতো আশীর্বাদ, শতো শুভ কামনা।

ভালোবাসা তখনই সর্বোত্তম, যখন তা থেকে দেখা দেয় কঠোর যাতনা।
যে ব্যথাকে এড়িয়ে বলে, সে ভালোবাসা কি তা বুঝতে পারে না।
সেই একজন বীর যে রয়েছে ভালোবাসার যাত্রায়;
নিঃসংশয়ে সে করতে পারে, তার জীবনটাকে আত্মসমর্পণ।

ভালোবাসা হলো শুরু হতে অমরত্ব পর্যন্ত।
প্রেমের সন্ধানকারীরা, চিরকাল অগণিত।
আগামীকাল, কিয়ামত দিবসের দিন।

যে কোন হৃদয় যেটি হবে ভালোবাসা শূণ্য,
সেটি ছাড়পত্র পেতে হবে ব্যর্থ,
ভালেবাসা হলো, উদীয়মান সূর্যের আলকেমি (রসায়নবিদ),

একটি মেঘের ভেতর এবং আমার অভ্যন্তরে, তা হলো শত সহস্র বজ্রপাত,
ভালোবাসার মহিমা, সমুদ্রের মতো ছড়িয়ে পড়ে,
নিমজ্জিত করে, উর্ধ্বের সমস্ত ছায়াপথগুলিকে।

ভালোবাসা হলো, একটি দর্পন,
তুমি তোমার প্রতিফলন ব্যতিত আর কিছুই দেখতে পাও না,
তোমার আসল চেহারা ছাড়া আর কিছুই দেখো না।

ভুলে যাও তোমার যতো উদ্বেগ

আমার জাগ্রত স্বপ্নের মাঝে,
আমি দেখেছি আমার প্রিয়ার ফুলের বাগান,
আমার মাথা ঝিমঝিমানির মাঝে,
ঘুর-পাকের মাঝে,
আমার মাতালতায় ঝাপসা দেখার মাঝে,
আমি চরকার মতো ঘুরছি
আর নেচে নেচে বেড়িয়ে চলেছি।

আমি দেখেছি আমায় সেখানে,
অস্তিত্বের শুরু ছিলো সেখানে,
শুরুতে ছিলাম আমি সেখানে,
এবং আমি ছিলাম ভালোবাসার চেতনা।

আমি হয়েছি এখন শান্ত
সেখানে রয়েছে,
মাতালপনার ঘোর কাটিয়ে উঠার তীব্র যন্ত্রণা।
আর আছে ভালোবাসাী স্মৃতি।

সুখের কামনায় আমি হয়েছি আকুল
আমি চাই সাহায্য আমার প্রার্থনায়,
আমার চাই আরো অনেক কৃপা,
এবং আমার হৃদয়ের ভেতরে কে যেনো চুপিচুপি বলছে,
আমায় তুমি দেখো,
আমায় তুমি শোনো,
কারণ আমিতো এখানে এসেছি শুধু তোমারই জন্যে।

আমি তোমার চাঁদ।
আর আমিই আমার চাঁদের আলো।
আমি তোমার ফুলের বাগান।
এবং তোমার পানি।

জুতো কিংবা শাল ছাড়াই
দূরের পথ পেরিয়ে এসেছি আমি;
শুধু তোমায় পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।

আমি চাই তুমি হও প্রফুল্ল,
চাই তুমি ভুলে যাও তোমার যতো উদ্বেগ।
তোমায় তুমি ভালোবাসো,
তোমায় করো তুমি উৎফুল্ল।

হে গভীর মনোবেদনা কাতর
আমিইতো করবো তোমায় প্রশান্ত,
করবো তোমায় সব রোগমুক্ত,
আমি আনবো তোমার জন্যে একগুচ্ছ গোলাপ,
আমিও যে ছিলাম একদিন,
কাঁটার ভেতরে আবৃত।

Leave a Comment