You are currently viewing ওথেলো : ঈর্ষা একটি অমর প্রেমকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল

ওথেলো : ঈর্ষা একটি অমর প্রেমকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল

“One that loved not wisely but too well.”
— Othello (Act 5, Scene 2)

শেক্সপিয়ারের সাহিত্যজীবনে ওথেলো নাটকটি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। ওথেলোকে শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট, কিং লেয়ার এবং ম্যাকব্যাথ এর মতো জগদ্বিখ্যাত ট্র্যাজিক নাটকের  পাশে স্থান দেয়া হয়। এই নাটকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই নাটক মানুষের মনোজগতের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছে। নাটকে ওথেলোর ঈর্ষা, অনিরাপত্তাবোধ এবং ইয়াগোর  প্রতারণা এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তা আজকের আধুনিক সমাজে এখনো প্রাসঙ্গিক। ওথেলোর অন্ধ বিশ্বাস , ইয়াগোর কূটচাল এবং ডেসডিমোনার নির্মল ভালোবাসা মানবচরিত্রের জটিলতাকেঙ গভীরভাবে উন্মোচন করে।

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার Image Courtesy: Reddit


ওথেলো নাটকটি শুধু একটি করুণ প্রেমের গল্প নয়। মানুষের দুর্বলতা, আবেগ আর ভুল সিদ্ধান্তের যে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে এটি তার একটি চিরন্তন প্রতিচ্ছবি। এছাড়া বর্ণবাদ, লিঙ্গবৈষম্য, ক্ষমতার রাজনীতি এবং মানসিক প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয়গুলোও এই নাটকের মধ্যে বহুমাত্রিকতা দান করেছে। আর তাই আজ চার শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ওথেলো আজো সারা বিশ্বে সমানভাবে পঠিত, মঞ্চস্থ এবং আলোচিত হচ্ছে। মানুষের জীবনের গভীর দিককে এমন শৈল্পিকভাবে উপস্থাপনের জন্য আজও এই নাটকটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি হিসেবে স্বীকৃত।

ওথেলো নাটকের শুরু হয় ভেনিস নগরীতে। ভেনিস নগরীতে ওথেলো একজন সম্মানিত মুর সেনাপতি। ওথেলো তার  সাহসিকতা ও সামরিক দক্ষতার জন্য একজন আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ হওয়া সত্তেও নগরীর সবার শ্রদ্ধাভাজন। তিনি গোপনে বিয়ে করেন ডেসডিমোনাকে, যিনি ভেনিসের অভিজাত ব্যক্তি ব্রাবানশিওর কন্যা। এই বিয়ে মেনে নিতে না পেরে ভেনিসের সিনেট ব্রাবানশিও ওথেলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন যে তিনি জাদুবিদ্যার মাধ্যমে ডেসডিমোনাকে আকৃষ্ট করেছেন। তবে ডিউকের আদালতে ডেসডিমোনা নিজেই জানিয়ে দেন যে তিনি স্বেচ্ছায় ওথেলোকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন।

ওথেলোর শৈশব ও যৌবন ছিল অত্যন্ত কঠিন ও বিপদসংকুল। অল্প বয়স থেকেই তিনি যুদ্ধ, ভ্রমণ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি  বেড়ে ওঠেন। তার জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি বন্দি হয়েছেন, দাস হিসেবে বিক্রি হওয়ার ঝুঁকিতেও পড়েছেন এবং মৃত্যুর মুখোমুখিও হয়েছেন। তিনি দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করেছেন এবং নানা জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। নিজের জীবনের এইসব রোমাঞ্চকর ও দুঃসহ অভিজ্ঞতার গল্প ডেসডিমোনার পিতা ব্রাবানশিওর বাড়িতে যাওয়া আসার মাঝে তিনি বলেছেন। সেই গল্প শুনেই মূলত ডেসডিমোনা ওথেলোর সাহস, সততা ও সংগ্রামী জীবনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। আদালতে নিজের প্রেম ও বিয়ের কথা অকপটে স্বীকার করে নিলে ডেসডিমোনার পিতা সেনেটর ব্রাবানশিওর আর কিছুই করার থাকে না। এই ঘটনার পরপরই তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ওথেলোকে সাইপ্রাসে পাঠানো হয় এবং ডেসডিমোনাও তাঁর সঙ্গে সেখানে চলে যান।

Image Courtesy: Amazon.in

সাইপ্রাসে পৌঁছানোর পর যুদ্ধের আশঙ্কা কেটে গেলেও নতুন এক সংকটের সূচনা হয়। ওথেলোর বিশ্বস্ত সহকারী হওয়ার আশা করেছিলেন ইয়াগো, কিন্তু সেই পদে নিয়োগ পান তরুণ কর্মকর্তা ক্যাসিও। এই সিদ্ধান্তে অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে ইয়াগো প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। সে জানত, সরাসরি দ্বৈত যুদ্ধে সে ওথেলোকে হারাতে পারবে না; তাই সে ওথেলোর বিশ্বাস ও মানসিক শান্তিকেই নিজের লক্ষ্যবস্তু বানায়।

আরো পড়ুন:  ইলিয়াড : যুদ্ধ, বীরত্ব ও ট্রাজেডির মিশেলে হোমারের অমর এক মহাকাব্য

ইয়াগো প্রথমে ক্যাসিওকে মদ্যপ অবস্থায় মারামারিতে জড়িয়ে চাকরি হারাতে বাধ্য করে। এরপর সে ক্যাসিওকে পরামর্শ দেয় ডেসডিমোনার সাহায্য চাইতে, যাতে তিনি ওথেলোর কাছে সুপারিশ করেন। আর এই ঘটনাকেই ইয়াগো এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন ক্যাসিও ও ডেসডিমোনার মধ্যে গোপন প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। ইয়াগো তার ষড়যন্ত্রকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে সে ডেসডিমোনার রুমালটি কৌশলে ক্যাসিওর ঘরে পৌঁছে দেয়; যেটি ওথেলো বিয়ের রাতে ডেসডিমোনাকে উপহার দিয়েছিল। আর এই রুমালই হয়ে শেষে ওঠে ওথেলোর সন্দেহের সবচেয়ে বড় ‘প্রমাণ’।  

ইয়াগোর কৌশলী কথাবার্তা ও সাজানো ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে ওথেলোর মনে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একসময় ওথেলো বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তার প্রিয় ডেসডিমোনা হয়তো তাঁর প্রতি অবিশ্বস্ত নেই। ডেসডিমোনা হয়তো ক্যাসিওর সাথে গোপন প্রণয়ে জড়িয়েছে। ওথেলো এখন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ; হয়ত ডেসডিমোনা এখন তার ভুল বুঝতে পেরে নিজের স্বজাতির সাথে প্রণয়ে লিপ্ত হয়েছে। একসময় যে ওথেলো নিজের বুদ্ধি আর সাহসের জন্য সুপরিচিত ছিলেন আজ সেই ম্নুশ্তি নিজের ঈর্ষা আর অনিরাপত্তাবোধের কাছে পরাজিত। সত্য যাচাই না করেই তিনি স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং প্রতিশোধ নেবার সিদ্ধান্ত নেন। ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে ওথেলো এক রাতে শ্বাসরোধ করে নিজের প্রাণপ্রিয় স্ত্রী ডেসডিমোনাকে হত্যা করেন। হত্যার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইয়াগোর স্ত্রী এমিলিয়া ইয়াগোর সমস্ত ষড়যন্ত্রের সত্য প্রকাশ করেন। তখন ওথেলো বুঝতে পারেন, ডেসডিমোনা সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন এবং তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। নিজের ভয়াবহ ভুল উপলব্ধি করে তিনি গভীর অনুশোচনায় ভেঙে পড়েন।

সব ষড়যন্ত্র প্রকাশ পাওয়ার পর ইয়াগোকে গ্রেফতার করা হয়; কিন্তু ইয়াগো নিজের উদ্দেশ্য আর অপকর্মের ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দিতে অস্বীকার করে। অপরদিকে নিজের নিরপরাদ স্ত্রী ডেসডিমোনাকে হত্যা করার অপরাধবোধে ওথেলো নিজের তলোয়ার দিয়ে আত্মহত্যা করেন।  এভাবেই প্রেম, বিশ্বাস, প্রতারণা এবং ঈর্ষার সংঘাতে এক করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে নাটকের সমাপ্তি ঘটে। এই নাটকের ওথেলো চরিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের মনের অযাচিত সন্দেহ ও ঈর্ষা মানুষের বিচারবুদ্ধিকে পুরোপুরি অন্ধ করে দিতে পারে এবং এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্ত একটি সুন্দর সম্পর্কের পাশাপাশি একটি জীবনও ধ্বংস করে দিতে পারে।

Author

  • শৈশব থেকেই ইতিহাস, মিথলজি আর শিল্পের অলিগলি আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হতো। ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা সেই বিস্ময়কে পরিণত করেছে ভালোবাসায়। আমি মনে করি, জগতকে বোঝার সেরা উপায় হলো পাঠ করা আর নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করার সেরা মাধ্যম হলো লেখা। তাই কেবল জানানোর জন্য নয়, বরং লিখতে ভালোবাসি বলেই আমার এই শব্দযাত্রা। নতুনের সন্ধানে বিরামহীন ছুটে চলা আর সেই অভিজ্ঞতার নির্যাসটুকুই আমি এখানে ভাগ করে নিই।

    লেখক ও সম্পাদক, মুখোশ.নেট

    View all posts