মানুষ সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলেও তার ভেতরে বাস করে সহিংসতা,ভয়,লোভ আর ক্ষমতার মিশ্রণে সৃষ্ট অদৃশ্য এক দানব। লোভ, লালসা কিংবা সহিংসতার মতো জিনিসগুলো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মধ্যেই রয়েছে। আর সেই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আমদের সভ্য সমাজের তৈরি করা আইন, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলাগুলো। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ে তখন মানুষের প্রকৃত রূপ কেমন হতে পারে; সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছেন উইলিয়াম গল্ডিং তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইস’ এর মাধ্যমে।
১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হওয়া এই উপন্যাসের মাধ্যমে গোল্ডিং দেখিয়েছেন; একটি নির্জন দ্বীপে আটকে পড়া কয়েকজন কিশোর কিভাবে সভ্য মানুষ থেকে বর্বর মানুষে রূপান্তরিত হয়। উপন্যাসের শুরুতে দ্বীপটি কিশোর ছেলেদের কাছে স্বাধীন ও নিরাপদ স্থান মনে হলেও; সময়ের সাথে সাথে তা ভয়,সংঘাত আর ক্ষমতার লড়াইয়ের এক সহিংস মঞ্চে পরিণত হয়। উইলিয়াম গোল্ডিং এই উপন্যাসে রালফ, জ্যাক, সাইমন ও পিগি চরিত্রগুলোর মাধ্যমে মানুষের প্রবৃত্তি ও মানসিক অবস্থাকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করেছেন। আর তাই এই উপন্যাসকে অন্য সাধারণ কোনো এডভেঞ্চার গল্পের সাথে তুলনা করা চলে না। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস; যা মানব সভ্যতার অন্ধকার ও ভঙ্গুরতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে।

উইলিয়াম গোল্ডিং এই উপন্যাসের প্লট নিয়েছিলেন R. M. Ballantyne এর ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘দ্য কোরাল আইল্যান্ড’ নামক উপন্যাস থেকে। তবে পার্থক্য হচ্ছে উইলিমাম গোল্ডিং ইচ্ছে করেই গল্পের কাহিনী উলটে দিয়ে ছিলেন। দুই উপন্যাসেই কয়েকজন ব্রিটিশ কিশোর একটি নির্জন দ্বীপে আটকে পড়ে কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বিপরীত। ‘দ্য কোরাল আইল্যান্ড’ উপন্যসের কিশোরেরা ছিল সাহসী, সভ্য ও নৈতিক; অন্যদিকে ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইস’ উপন্যসের কিশোরেরা হয়ে উঠেন সহিংস ও বর্বর।
উপন্যসের শুরুতে দেখা যায় প্রচণ্ড এক যুদ্ধের মাঝখানে, ব্রিটেন থেকে একদল স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে একটি বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু বিমান দূর্ঘটনার শিকার হয়ে তারা একটি নির্জন দ্বীপে এসে পড়েন। ছেলেদের মধ্যে দুজন রালফ ও পিগি, সৈকতে একটি ঝিনুক বা শাঁখ (কঞ্চ) খুঁজে পায়। পিগি বুঝতে পারে এটি বাজিয়ে অন্য ছেলেদের একত্র করার জন্য শিঙা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। সবাই একত্র হলে, তারা রালফকে তাদের নেতা নির্বাচিত করে এবং উদ্ধার পাওয়ার উপায় খোঁজার কাজে নেমে পড়ে। আর রালফ জ্যাক নামের আরেক ছেলেকে পুরো দলের জন্য শিকারের দায়িত্বে নিযুক্ত করে।
রালফ ঘোষণা করে যে, উড়োজাহাজ বা জাহাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তাদের একটি সিগনাল ফায়ার জ্বালাতে হবে। পিগির চশমার কাচ দিয়ে সূর্যের আলো এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে তারা কিছু শুকনো কাঠে আগুন জ্বালাতে সক্ষম হয়। কিন্তু ছেলেরা আগুনের দিকে খেয়াল রাখার চেয়ে নিজেদের খেলাধুলোয় বেশি মশগুল হয়ে ছিল। ফলে দ্রুতই সেই আগুন পুরো বনে ছড়িয়ে পড়ে। শুকনো কাঠের এক বিশাল অংশ অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুড়ে যায় এবং সবচেয়ে ছোট ছেলেদের একজন নিখোঁজ হয়ে যায়, ধারণা করা হয় সে হয়তো আগুনে পুড়ে মারা গেছে।

শুরুর দিকে ছেলেরা খেলাধুলো আর পানিতে সাঁতার কেটে আনন্দ করছিল। তাদের কর্মকান্ডে রালফ বেশ বিরক্ত ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। সে তাদের বলে তাদের সিগনাল ফায়ার সবসময় জ্বালিয়ে রাখা আর আশ্রয়ের জন্য জায়গা তৈরি করা উচিৎ। অপরদিকে শিকারের জন্য তৈরি করা দল বুনো শুকর ধরতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের নেতা জ্যাক শিকারের ব্যাপারে ক্রমেই অন্ধ ও মশগুল হয়ে পড়ে।
একদিন রালফ ও পিগি দেখতে পায়, দিগন্তে একটি জাহাজ যাচ্ছে, কিন্তু তাদের সিগনাল ফায়ার নিভে গেছে। সিগনাল ফায়ার জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব ছিল শিকারি দলের। রালফ ক্ষুব্ধ হয়ে জ্যাককে জবাবদিহি করতে গিয়ে দেখা যায়; জ্যাক ও তার শিকারি দল প্রথম শিকার সম্পন্ন করে উন্মাদ হয়ে আনন্দে মশগুল হয়ে আছে। এদিকে ছেলেদের মধ্যে দ্বীপের অদৃশ্য দানবকে নিয়ে ভয় বাড়তে থাকে। ছোট ছেলেরা দুঃস্বপ্নে ভুগছিল এবং অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে দ্বীপে কোনো ভয়ংকর প্রাণী লুকিয়ে আছে।
এর কিছুদিন পর, এক রাতে আকাশে যুদ্ধরত সামরিক বিমানের একটি মৃত সৈনিক প্যারাসুটসহ পাহাড়ে নেমে আসে। আগুন পাহারা দেওয়ার দায়িত্বে থাকা স্যাম ও এরিক ঘুমিয়ে থাকায় তারা ঘটনাটি দেখতে পায়নি। জেগে উঠে তারা প্যারাসুটের বিশাল ছায়া ও অদ্ভুত শব্দ দেখে সেটিকে দানব মনে করে আতঙ্কে পালিয়ে যায়। তাদের কথায় অন্য ছেলেরাও দানবের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করে। দানবকে খুঁজতে রালফ ও জ্যাকসহ একটি দল পাহাড়ে যায়। দূর থেকে মৃত সৈনিক ও প্যারাসুটের ছায়াকে তারা বিশাল গরিলা বা বানরের মতো মনে করে; রালফ তাদের আর সামনে আগাতে বারন করে। সভায় জ্যাক রালফকে কাপুরুষ বলে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে চাইলেও অন্যরা তাকে সমর্থন করে না। জ্যাক রাগ করে আলাদা হয়ে নতুন শিকারি দল গঠন করে। রালফ সিগনাল ফায়ার জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও অনেক ছেলে ক্রমান্বয়য়ে জ্যাকের দলে চলে যেতে থাকে।
জ্যাক ও তার শিকারিরা একটি মাদী শুকরকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর তার মাথা কেটে একটি খুঁটির ওপর গেঁথে রাখে দ্বীপের দানবটিকে উৎসর্গ করার জন্য। যেমনটা আদিম বর্বর সমাজের মানুষেরা বিভিন্ন অপদেবতাদের খুশি করতে বিভিন্ন প্রাণী উৎসর্গ করতো। ছেলেদের মধ্যেও সেই আদিম বর্বর বৈশিষ্ট্যগুলো স্থান করে নিতে শুরু করে। রক্তে ভেজা শুকরের মাথাটির চারদিক মাছিতে ঢেকে যায়। আর এই কারণেই সাইমন এটিকে ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইস’ নামে কল্পনা করে। লেখক শুকরের কাটা মাথাটিকে শয়তান বা অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
সাইমন যখন একা শুকরের মাথাটির সামনে দাঁড়ায়, তখন তার মনে হয় মাথাটি তার সঙ্গে কথা বলছে। তার কল্পনায় ‘লর্ড অব দ্য ফ্লাইস’ তাকে বলে যে দ্বীপে কোনো বাইরের দানব নেই; আসল দানব তো মূলত মানুষের নিজের ভেতরেই বাস করে। সাইমন বুঝতে পারে, ছেলেদের ভয়, হিংস্রতা ও বর্বরতার উৎস আসলে তাদের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে। পরে সে পাহাড়ে গিয়ে দেখে যে কথিত দানবটি আসলে প্যারাসুটে নেমে আসা মৃত সৈনিক। এই সত্যটি বুঝতে পেরে সে অন্য ছেলেদের জানাতে সৈকতের দিকে যায়। কিন্তু উম্মাদ অবস্থায় থাকা ছেলেরা তাকে দানব মনে করে আক্রমণ করে এবং হত্যা করে। এই উপন্যাসে সাইমন হলো মানবিক চরিত্র; যে অন্যদের ভয় ও বিভ্রান্তির মধ্যেও সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে। তার মৃত্যু দেখায়, বর্বর ও উন্মত্ত সমাজে সত্য উপলব্ধিকারী মানুষও কীভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
পরের এক রাতে রালফ ও পিগি তাদের কৃতকর্ম নিয়ে আলোচনা করছিল। জ্যাকের শিকারিরা তাদের এবং তাদের অল্প কয়েকজন অনুসারীর ওপর আক্রমণ চালায় এবং সেই আক্রমণের সময় তারা পিগির চশমাটি ছিনিয়ে নেয়। কারণ চশমা দিয়ে আগুন জ্বালানো যেত। এখানে চশমা আসলে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। রালফের দলটি কথা বলে সকল সমস্যা মিটমাট করার জন্য জ্যাকের ঘাঁটিতে যায়; কিন্তু জ্যাক স্যাম ও এরিককে বেঁধে ফেলার আদেশ দেয় এবং রালফের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। সেই লড়াইয়ের মধ্যেই, রজার নামের একটি ছেলে পাহাড় থেকে একটি বড় পাথর গড়িয়ে দেয়, যা পিগির শরীরকে আঘাত করে তাকে হত্যা করে। সেই সাথে পিগি তার হাতে বহন করা শাঁখটিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলে। রালফ কোনোভাবে বর্শার আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে যায়। লেখক উইলিয়াম গোল্ডিং এটি শুধু একটি শাঁখ ভাঙা নয়। এর মাধ্যমে তিনি দেখান যে দ্বীপে সভ্যতা, গণতন্ত্র ও নৈতিকতার অবশিষ্ট প্রতীকটিও ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এরপর আর কোনো নিয়ম, সভা বা গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ব কার্যকর থাকে না। জ্যাকের দল শক্তি ও সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে।
রালফ বাকি পুরোটা সময় দ্বীপে লুকিয়ে থাকে, আর অন্য ছেলেরা তাকে পশুর মতো শিকার করার জন্য হন্য হয়ে খুঁজতে থাকে। রালফকে লুকিয়ে থাকা জায়গা থেকে বের করে আনার জন্য জ্যাক অন্য ছেলেদের বনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। রালফ প্রাণ বাঁচানোর জন্য জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সমুদ্রসৈকতের দিকে দৌড়াতে শুরু করে। সেখানে পৌঁছে সে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ সে দেখতে পায়, তার সামনে একজন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন। মূলত জ্যাকের দল রালফকে খুঁজতে পুরো জঙ্গলে যে আগুন লাগিয়েছিল, সেই অগ্নিকুন্ডলির ধোঁয়া দেখেই একটি নৌযান দ্বীপের কাছে এসে থেমেছিল। অন্য ছেলেরাও সৈকতে এসে কর্মকর্তাকে দেখে থেমে যায়। এতক্ষণ যারা হিংস্রভাবে রালফকে শিকার করছিল, তারা হঠাৎ আবার নিজেদের সভ্য সমাজের শিশু হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে। নৌবাহিনীর কর্মকর্তা তাদের অবস্থা দেখে বিস্মিত হন এবং রালফকে জিজ্ঞেস করেন এখানে কী ঘটেছে। রালফ প্রথমে স্বস্তি অনুভব করলেও পরে পিগি ও সাইমনের মৃত্যু, নিজেদের হারানো নিষ্পাপত্ব এবং দ্বীপের সমস্ত ভয়াবহ ঘটনা মনে করে কাঁদতে শুরু করে। অন্য ছেলেরাও কাঁদতে থাকে। রালফ বুঝতে পারে তারা শুধু দ্বীপে আটকে পড়া কিছু শিশু ছিল না; এই দ্বীপে তারা নিজেদের ভেতরের অন্ধকার ও বর্বরতার মুখোমুখি হয়েছিল।
