বিষবৃক্ষ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি উপন্যাস। এটি বঙ্কিমচন্দ্রের চতুর্থ বাংলা উপন্যাস এবং তাঁর বিষবৃক্ষ-কৃষ্ণকান্তের উইল-রজনী গার্হস্থ্যধর্মী উপন্যাসত্রয়ীর অন্যতম। ১২৭৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যা (১৮৭২) থেকে চৈত্র সংখ্যা (১৮৭৩) পর্যন্ত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় মোট বারোটি কিস্তিতে বিষবৃক্ষ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭৩ সালের ১ জুন। এই উপন্যাসটি আধুনিক বাংলা উপন্যাস সাহিত্যের আদিযুগের একখানি উপন্যাস। বিষবৃক্ষ উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল সমসাময়িক বাঙালি হিন্দু সমাজের দুটি প্রধান সমস্যা – বিধবাবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথা। এই উপন্যাসের পটভূমি বিধবাবিবাহ আইন পাশ হওয়ার সমসাময়িক কাল।
১
এই বৃক্ষ মহাতেজস্বী; একবার ইহার পুষ্টি হইলে, আর নাশ নাই। এবং ইহার শোভা অতিশয় নয়নপ্রীতিকর; দূর হইতে ইহার বিবিধবর্ণ পল্লব ও সমুৎফল্ল মুকুলদাম দেখিতে অত্যন্ত রমণীয়। কিন্তু ইহার ফল বিষময়; যে খাই, সেই মরে।
২
আপনাকে অতি অধম লোকে ভালবাসিলেও তাহার ভালবাসা লইয়া তামাসা করা ভালো নয়।
৩
যে শোকে রোদন নাই, সে যমের দূত।
৪
শ্রীশচন্দ্রের কলমে একটু কালি ছিল। শ্রীশ সেই কলম লইয়া পশ্চাৎ হইতে গিয়া কমলের কপালে একটি টিপ কাটিয়া দিলেন।
৫
তখন কমল হাসিয়া বলিলেন, “প্রাণাধিক, আমি তোমায় কত ভালবাসি।” এই বলিয়া কমল শ্রীশচন্দ্রের স্কন্ধ বাহু দ্বারা বেষ্টন করিয়া, তাহার মুখচুম্বন করিলেন, সুতরাং টিপের কালি সমুদায়টাই শ্রীশের গালে লাগিয়া রহিল।
৬
এত দিন যত্নে ধর্ম্মরক্ষা করিয়া, একদিনের সুখের জন্য তাহা নষ্ট করিয়া উৎসৃষ্টার্থ কৃপণের ন্যায় চিরানুশোচনার পথে দন্ডায়মান হইল।
৭
কিল দেখিয়া শ্রীশচন্দ্র কমলমণির খোঁপা খুলিয়া দিলেন। এখন বর্দ্ধিতরোষা কমলমণি শ্রীশচন্দ্রের দোয়াতের কালি পিকদানিতে ঢালিয়া ফেলিয়া দিল।
৮
রাগে শ্রীশচন্দ্র দ্রুতগতিতে ধাবমান হইয়া কমলমণির মুখচুম্বন করিলেন। রাগে কমলমণিও অধীরা হইয়া শ্রীশচন্দ্রের মুখচুম্বন করিল।
৯
অবিচ্ছিন্ন সুখ, দুঃখের মূল; পূর্ব্বগামী দুঃখ ব্যতীত, স্থায়ী সুখ জন্মে না।
১০
লোক বলে, “সকলই দুষ্টের দোষ।” দুষ্ট বলে, “আমি ভাল মানুষ হইতাম-কিন্তু লোকের দোষে দুষ্ট হইয়াছি।” লোকে বলে, “পাঁচ কেন সাত হইল না?” পাঁচ বলে, “আমি সাত হইতাম-কিন্তু দুই আর পাঁচে সাত-বিধাতা অথবা বিধাতার সৃষ্ট লোক যদি আমাকে আর দুই দিত, তা হইলেই আমি সাত হইতাম।”
১১
যত্ন এক, ভালবাসা আর, ইহার মধ্যে প্রভেদ কি, আমরা স্ত্রীলোক সহজেই বুঝিতে পারি।
১২
তুমি বলিবে, যদি এক পুরুষের দুই স্ত্রী হইতে পারে, তবে এক স্ত্রীর দুই স্বামী হয় না কেন? উত্তর-এক স্ত্রীর দুই স্বামী হইলে অনেক অনিষ্ট ঘটিবার সম্ভাবনা; এক পুরুষের দুই বিবাহ তাহার সম্ভাবনা নাই। এক স্ত্রীর দুই দুইটা স্বামী হইলে সন্তানের পিতৃনিরুপণ হয় না-পিতাই সন্তানের পালনকর্তা-তাহার অনিশ্চয়ে সামাজিক উচ্ছৃঙ্খলতা জন্মিতে পারে। কিন্তু পুরুষের দুই বিবাহ সন্তানের মাতার অনিশ্চয়তা জন্মে না। ইত্যাদি আরও অনেক কথা বলা যাইতে পারে।
১৩
প্রায়শ্চিত্ত! পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত হয়। দুঃখের ত প্রায়শ্চিত্ত নাই। দুঃখের প্রায়শ্চিত্ত কেবল মৃত্যু। মরিলেই দুঃখ যায়।
১৪
যত দিন মানুষের আশা থাকে, তত দিন কিছুই না, আশা ফুরালে সব ফুরাইল!