সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৫ আগস্ট ১৯২৬ – ১৩ মে ১৯৪৭) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী এবং প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ কবি। সুকান্ত ভট্টাচার্যের মাত্র একুশ বৎসর বয়সে প্রতিভাধর কবির দেহাবসান ঘটলেও সামান্য কয়েকবছরে অত্যাশ্চর্য কবিত্ব শক্তির পরিচয় দিয়ে অশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য, মা সুনীতি দেবী। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট তিনি তার মাতামহের বাড়ি কলকাতার কালীঘাটের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রীটের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম। তার পৈতৃক বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অন্তর্গত ঊনশিয়া গ্রামে। বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। এই সময় ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। সুকান্তের বাল্যবন্ধু ছিলেন কবি অরুণাচল বসু। সুকান্ত সমগ্রতে লেখা সুকান্তের চিঠিগুলির বেশিরভাগই অরুণাচল বসুকে লেখা। অরুণাচল বসুর মাতা কবি সরলা বসু সুকান্তকে পুত্রস্নেহে দেখতেন। কবির জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছিল কলকাতার বেলেঘাটার ৩৪ হরমোহন ঘোষ লেনের বাড়ীতে। সেই বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে। নিকটেই কবির ভাইদের মধ্যে দুজন, বিভাস ভট্টাচার্য ও অমিয় ভট্টাচার্যের বাড়ী। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুকান্তের সম্পর্কিত ভ্রাতুষ্পুত্র। (তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া)
বোধন
সুকান্ত ভট্টাচার্য
হে মহামানব, একবার এসো ফিরে
শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভীড়ে,
এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার;
লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।
এই যে আকাশ, দিগন্ত, মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি
নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি;
কোথাও নেইকো পার
মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার
আঘাতে আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল,
এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল,
ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো,
হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।
ব্যহত জীবনযাত্রা, চুপি চুপি কান্না বও বুকে,
হে নীড়-বিহারী সঙ্গী! আজ শুধু মনে মনে ধুঁকে
ভেবেছ সংসারসিন্ধু কোনমতে হয়ে যাবে পার
পায়ে পায়ে বাঁধা ঠেলে। তবু আজো বিস্ময় আমার-
ধূর্ত, প্রবঞ্চক যারা কেড়েছে মুখের শেষ গ্রাস
তাদের করেছ ক্ষমা, ডেকেছ নিজের সর্বনাশ।
তোমার ক্ষেতের শস্য
চুরি ক’রে যারা গুপ্তকক্ষে জমায়
তাদেরি দু’পায়ে প্রাণ ঢেলে দিলে দুঃসহ ক্ষমায়;
লোভের পাপের দুর্গ গম্বুজ ও প্রাসাদে মিনারে
তুমি যে পেতেছ হাত; আজ মাথা ঠুকে বারে বারে
অভিশাপ দাও যদি, বারংবার হবে তা নিস্ফলÑ
তোমার অন্যায়ে জেনো এ অন্যায় হয়েছে প্রবল।
তুমি তো প্রহর গোনো,
তারা মুদ্রা গোনে কোটি কোটি,
তাদের ভাণ্ডার পূর্ণ; শূন্য মাঠে কঙ্কাল-করোটি
তোমাকে বিদ্রুপ করে, হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে-
কুজ্বটি তোমার চোখে, তুমি ঘুরে ফেরো দুর্বিপাকে।
পৃথিবী উদাস, শোনো হে দুনিয়াদার!
সামনে দাঁড়িয়ে মৃত্যু-কালো পাহাড়
দগ্ধ হৃদয়ে যদিও ফেরাও ঘাড়
সামনে পেছনে কোথাও পাবে না পার;
কি করে খুলবে মৃত্যু-ঠেকানো দ্বার-
এই মুহূর্তে জবাব দেবে কি তার?
লক্ষ লক্ষ প্রাণের দাম
অনেক দিয়েছি; উজাড় গ্রাম।
সুদ ও আসলে আজকে তাই
যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য চাই।
কৃপণ পৃথিবী, লোভের অস্ত্র
দিয়ে কেড়ে নেয় অন্নবস্ত্র,
লোলুপ রসনা মেলা পৃথিবীতে
বাড়াও ও-হাত তাকে ছিঁড়ে নিতে।
লোভের মাথায় পদাঘাত হানো-
আনো, রক্তের ভাগীরথী আনো।
দৈত্যরাজের যত অনুচর
মৃত্যুর ফাঁদ পাতে পর পর;
মেলো চোখ আজ ভাঙো সে ফাঁদ-
হাঁকো দিকে দিকে সিংহনাদ।
তোমার ফসল, তোমার মাটি
তাদের জীয়ন ও মরণকাঠি
তোমার চেতনা চালিত হাতে।
এখনও কাঁপবে আশঙ্কাতে?
স্বদেশপ্রেমের ব্যঙ্গমা পাখি
মারণমন্ত্র বলে, শোনো তা কি?
এখনো কি তুমি আমি স্বতন্ত্র?
করো আবৃত্তি; হাঁকো সে মন্ত্র;
শোন্ রে মালিক, শোন্ রে মজুতদার!
তোদের প্রাসাদে জমা হল কত মৃত মানুষের হাড়-
হিসাব কি দিবি তার?
প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা,
ভেঙেছিস ঘরবাড়ি,
সে কথা আমি জীবনে মরণে
কখনো ভুলতে পারি?
আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই
স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের
চিতা আমি তুলবই।
শোন্ রে মজুতদার,
ফসল ফলানো মাটিতে রোপণ
করব তোকে এবার।
তারপর বহুশত যুগ পরে
ভবিষ্যতের কোন জাদুঘরে
নৃতত্ত্ববিদ হয়রান হয়ে মুছবে কপাল তার
মজুতদার ও মানুষের হাড়ে মিল খুঁজে পাওয়া ভার।
তেরোশো সালের মধ্যবর্তী মালিক, মজুতদার
মানুষ ছিল কি? জবাব মেলে না তার।
আজ আর বিমূঢ় আস্ফালন নয়,
দিগন্তে প্রত্যাসন্ন সর্বনাশের ঝড়;
আজকের নৈঃশব্দ হোক যুদ্ধারম্ভের স্বীকৃতি।
দুহাতে বাজাও প্রতিশোধের উন্মত্ত দামামা,
প্রার্থনা করো:
হে জীবন, হে যুগ- সন্ধিকালের চেতনা-
আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি,
প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের
তুষার গলানো উত্তাপ।
টুকরো টুকরো ক’রে ছেঁড়ো তোমার
অন্যায় আর ভিরুতার কলঙ্কিত কাহিনী।
শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে
একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।
তা যদি না হয় মাথার উপরে ভয়ঙ্কর
বিপদ নামুক, ঝড়ে বন্যায় ভাঙুক ঘর;
তা যদি না হয়, বুঝবো তুমি মানুষ নও-
গোপনে গোপনে দেশদ্রোহীর পতাকা বও।
ভারতবর্ষ মাটি দেয়নিকো, দেয় নি জল
দেয় নি তোমার মুখেতে অন্ন, বাহুতে বল
পূর্বপুরুষ অনুপস্থিত রক্তে, তাই
ভারতবর্ষে আজকে তোমার নেইকো ঠাঁই।।
দেশলাই কাঠি
সুকান্ত ভট্ট্যাচার্য
আমি একটা ছােট্ট দেশলাইয়ের কাঠি;
এতে নগণ্য হয়তাে চোখেও পড়ি না:
তবু জেনাে
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন—
আমাকে অবজ্ঞা-ভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কতো ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কতো প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাৎ;
আমি একা-ই ছােট্ট একটা দেশলাই কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে।
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন—
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাসে;
চমকে উঠেছিলে—
আমরা শুনেছিলাম তােমার বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ!
আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তাে অনুভব করেছ বারংবার;
তবু কেন বােঝো না,
আমরা বন্দী থাকব না তােমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব—
শহরে, গঞ্জে, গ্রামে—দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বারবার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়
তা তো তােমরা জানােই।
কিন্তু তােমরা তাে জানাে না?
কবে আমরা জ্বলে উঠব—
সবাই শেষ বারের মতাে!
আঠারো বছর বয়স
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আঠারাে বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তােলবার ঝুঁকি,
আঠারাে বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আঠারাে বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নােয়াবার নয়
আঠারাে বছয় বয়স জানে না কাঁদা।
এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য
বাষ্পের বেগে ষ্টীমারের মতাে চলে,
প্রাণ, দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শূন্য
সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে।
আঠারাে বছর বয়স ভয়ংকর
তাজা তাজা প্রাণে অসহ্য যন্ত্রণা,
এ বয়সে প্রাণ তীব্র আর প্রখর
এ বয়সে কানে আসে কত মন্ত্রণা।
আঠারাে বছর বয়স যে দুর্বার
পথে প্রান্তরে ছােটায় বহু তুফান,
দুর্যোগে হাল ঠিক মতাে রাখা ভার
ক্ষত বিক্ষত হয় সহস্র প্রাণ।
আঠারাে বছর বয়সে আঘাত আসে
অবিশ্রান্ত; একে একে হয় জড়াে,
এ বয়স কালাে লক্ষ দীর্ঘশ্বাসে
এ বয়স কাঁপে বেদনায় থরােথরাে।
তবু আঠাবাের শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তাে করে।
এ বয়স জেনাে ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোন সংশয়—
এ দেশের বুকে আঠারাে আসুক নেমে॥
ছাড়পত্র
সুকান্ত ভট্টাচার্য
যে শিশু ভুমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুম:
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।
খর্বদেহ নিঃসহায় তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
কী এক দুর্ব্যোধ্য প্রতিজ্ঞায়।
সে ভাষা বুঝে না কেউ,
কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।
আমি কিন্তু মনে মনে বুঝেছি সে ভাষা।
পেয়েছি নতুন চিঠি আসন্ন যুগের-
পরিচয়-পত্র পড়ি ভূমিষ্ঠ শিশুর,
অস্পষ্ট কুয়াশা ভরা চোখে।
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান,
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,
তারপর হবো ইতিহাস।
হে মহাজীবন
সুকান্ত ভট্টাচার্য
হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝংকার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো।
প্রয়ােজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—
কবিতা তােমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানাে রুটি॥
সিগারেট
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আমরা সিগারেট।
তােমরা আমাদের বাঁচতে দাও না কেন?
আমাদের কেন নিঃশেষ করে পুড়িয়ে?
কেন এতাে স্বল্প-স্থায়ী আমাদের আয়ু?
মানবতার কোন্ দোহাই তােমরা পাড়বে?
আমাদের দাম বড়াে কম এই পৃথিবীতে।
তাই কি তােমরা আমাদের শােষণ করাে?
বিলাসের সামগ্রী হিসাবে ফেলল পুড়িয়ে?
তােমাদের শােষণের টানে আমরা ছাই হই:
তােমরা নিবিড় হও আরামের উত্তাপে।
তােমাদের আরাম: আমাদের মৃত্যু।
এমনি ক’রে চ’লবে আর কতােকাল?
আর কততকাল আমরা এমন নিঃশব্দে ডাকবাে
আয়ু-হরণকারী তিল তিল অপঘাতকে?
দিন আর রাত্রি-রাত্রি আর দিন:
তােমরা আমাদের শােষণ ক’রছে সর্বক্ষণ—
আমাদের বিশ্রাম নেই, মজুরি নেই—
নেই কোন অল্পমাত্রার ছুটি।
তাই, আর নয়;
আর আমরা বন্দী থাকবে না
কৌটোয় আর প্যাকেটে,
আঙুলে আর পকেটে;
সােনা-বাঁধানাে ‘কেসে’ আমাদের নিঃশ্বাস হবে না রুদ্ধ।
আমরা বেরিয়ে পড়বাে;
সবাই একজোটে, একত্রে—
তারপর তােমাদের অসতর্ক মুহূর্তে
জ্বলন্ত আমরা ছিটকে পড়বাে তােমাদের হাত থেকে
বিছানায় অথবা কাপড়ে;
নিঃশব্দে হঠাৎ জ্বলে উঠে
বাড়িশুদ্ধ পুড়িয়ে মারবাে তােমাদের,
যেমন ক’রে তােমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছে এতােকাল॥
রানার
সুকান্ত ভট্ট্যাচার্য
রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বােঝা হাতে,
রানার চলেছে রানার!
রাত্রির পথে পথে চলে কোনাে নিষেধ জানে না মানার
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।
রানার! রানার!
জানা অজানার
বােঝা আজ তার কাঁধে,
বােঝাই জাহাজ রানার চ’লেছে চিঠি আর সংবাদে;
রানার চ’লেছে, বুঝি ভাের হয় হয়,
আরাে জোরে, আরাে জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়।
তার জীবনের স্বপ্নের মতাে পিছে সরে যায় বন,
আরাে পথ, আরাে পথ—বুঝি হয় লাল ও পূর্ব কোণ।
অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিটমিট ক’রে চায়
কেমন করে এ রানার সবেগে হরিণের মতাে যায়।
কত গ্রাম, কত পথ যায় স’রে স’রে—
শহরে রানার যাবেই পৌছে ভােরে;
হাতে লণ্ঠন করে ঠঠন, জোনাকিরা দেয় আলাে
মাভৈঃ, রানার, এখনাে রাতের কালাে।
এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছে ফেলে,
পৃথিবীর বােঝা ক্ষুধিত রানার পৌছে দিয়েছে ‘মেলে’
ক্লান্তশ্বাস ছুয়েছে আকাশ মাটী ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।
অনেক দুঃখে, বহু বেদনায় অভিমানে অনুরাগে,
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।
রানার! রানার!
এ বােঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?
রাত শেষ হ’য়ে সূর্য উঠবে কবে?
ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালাে ধোঁয়া,
পিঠেতে টাকার বােঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,
রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,
দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে
কত চিঠি লেখে লােকে—
কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কতাে দুঃখে ও শােকে
এর দুঃখের চিঠি প’ড়বে না জানি কেউ কোনাে দিনও,
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,
এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,
এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালাে রাত্রির খামে।
দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি,
এ-কে যে ভােরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি—
রানার! রানার! কি হবে এ বোঝা ব’য়ে?
কি হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষ’য়ে ক্ষ’য়ে?
রানার! রানার! ভাের তাে হ’য়েছে—আকাশ হ’য়েছে লাল,
আলাের স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?
রানার। গ্রামের রানার!
সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;
শপথের চিঠি নিয়ে চলাে আজ
ভীরুতা পিছনে ফেলে—
পৌঁছে দাও এ নতুন খবর
অগ্রগতির ‘মেলে’,
দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি,
নেই, দেরী নেই আর,
ছুটে চলল, ছুটে চলল, আরাে বেগে
দুর্দম হে রানার।
পুরনো ধাঁধা
সুকান্ত ভট্টাচার্য
বলতে পারো বড়মানুষ মোটর কেন চড়বে?
গরীব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে?
বড়মানুষ ভোজের পাতে ফেলে লুচি-মিষ্টি,
গরীবরা পায় খোলামকুচি, একী অনাস্থষ্টি?
বলতে পারো ধনীর বাড়ি তৈরি যারা করছে,
কুঁড়েঘরেই তারা কেন মাছির মতো মরছে?
ধনীর মেয়ের দামী পুতুল হরেকরকম খেলনা,
গরীব মেয়ে পায় না আদর, সবার কাছে ফ্যালনা।
বলতে পারো ধনীর মুখে যারা যোগায় খাদ্য,
ধনীর পায়ের তলায় তারা থাকতে কেন বাধ্য?
‘হিং-টিং-ছটু’ প্রশ্ন এসব, মাথার মধ্যে কামড়ায়,
বড়লোকের ঢাক তৈরি গরীল লোকের চামড়ায়॥
প্রিয়তমাসু
সুকান্ত ভট্ট্যাচার্য
সীমান্তে আজ আমি প্রহরী
অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে
আজ এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছি
স্বদেশের সীমানায়।
ধূসর তিউনিসিয়া থেকে স্নিগ্ধ ইতালী,
স্নিগ্ধ ইতালী থেকে ছুটে গেছি বিপ্লবী ফ্রান্সে
নক্ষত্র নিয়ন্ত্রিত নিয়তির মত
দুর্নিবার, অপরাহত রাইফেল হাতে;
-ফ্রান্স থেকে প্রতিবেশী বর্মাতেও।
আজ দেহে আমার সৈনিকের কড়া পোষাক
হাতে এখনো দুর্জয় রাইফেল,
রক্তে রক্তে তরঙ্গিত জয়ের আর শক্তির দুর্বহ দম্ভ,
আজ এখন সীমান্তের প্রহরী আমি।
আজ কিন্তু নীল আকাশ আমাকে পাঠিয়েছে আমন্ত্রণ
স্বদেশের হাওয়া বয়ে এনেছে অনুরোধ
চোখের সামনে খুলে ধরেছে সবুজ চিঠি;
কিছুতেই বুঝিনা কী করে এড়াব তাকে,
কী করে এড়াব এই সৈনিকের কড়া পোষাক?
যুদ্ধ শেষ; মাঠে মাঠে প্রসারিত শান্তি,
চোখে এসে লাগছে তারই শীতল হাওয়া,
প্রতি মুহুর্তে শ্লথ হয়ে আসে হাতের রাইফেল
গা থেকে খসে পড়তে চায় এই কড়া পোষাক
রাত্রে চাঁদ ওঠে, আমার চোখে ঘুম নেই।
তোমাকে ভেবেছি কতদিন,
কত শত্র“র পদক্ষেপ শোনার প্রতীক্ষার অবসরে
কত গোলা ফাটার মুহূর্তে।
কতবার অবাধ্য হয়েছে মন, যুদ্ধ জয়ের ফাঁকে ফাঁকে,
কতবার হৃদয় জ্বলেছে অনুশোচনার অঙ্গারে
তোমার আর তোমাদের ভাবনায়।
তোমাকে ফেলে এসেছি দারিদ্র্যের মধ্যে,
ছুঁড়ে দিয়েছি দুর্ভিক্ষের আগুনে,
ঝড়ে আর বন্যায় মারী আর মড়কের দুঃসহ আঘাতে
বার বার বিপন্ন হয়েছে তোমাদের অস্তিত্ব।
আর আমি ছুটে গেছি এক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আর এক যুদ্ধক্ষেত্রে।
জানিনা আজো আছো কি নেই,
দুর্ভিক্ষে ফাঁকা আর বন্যায় তলিয়ে গেছে কি-না ভিটে,
জানি না তাও।
তবু লিখছি তোমাকে আজ, লিখছি আত্মম্ভর আশায়,
ঘরে ফেরার সময় এসে গেছে।
জানি আমার জন্যে কেউ প্রতীক্ষা ক’রে নেই,
মালায় আর পতাকায় প্রদীপে আর মঙ্গল ঘটে
জানি সম্বর্ধনা রটবে না লোকমুখে,
মিলিত খুশীতে মিলবে না বীরত্বের পুরষ্কার।
তবু, একটি হৃদয় নেচে উঠবে আমার আবির্ভাবে-
সে তোমার হৃদয়।
যুদ্ধ চাইনা আর, যুদ্ধ তো থেমে গেছে;
পদার্পণ করতে চায় না মন ইন্দোনেশিয়ায়।
আর সামনে নয়,
এবার পেছন ফেরার পালা।
পরের জন্য যুদ্ধ করেছি অনেক,
এবার যুদ্ধ তোমার আর আমার জন্যে।
প্রশ্ন করো যদি এত যুদ্ধ করে পেলাম কী? উত্তর তার-
তিউনিসিয়ায় পেয়েছি জয়,
ইতালিতে জনগণের বন্ধুত্ব,
ফ্রান্সে পেয়েছি মুক্তির মন্ত্র;
আর নিষ্কন্টক বর্মায় পেলাম ঘরে ফেরার তাগাদা।
আমি যেন সেই বাতিওয়ালা-
যে সন্ধ্যায় রাজপথে-পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেরে
অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ্য
নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার।
