You are currently viewing পথের দাবী বিখ্যাত উক্তি : ২০ টি চমৎকার সংলাপ ও উক্তি

পথের দাবী বিখ্যাত উক্তি : ২০ টি চমৎকার সংলাপ ও উক্তি

পথের দাবী বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগের অন্যতম বাঙ্গালী কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক বিরচিত একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। এ উপন্যাসটি ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক অসাধারণ বিপ্লবী সব্যসাচী ও তার সাথীদের সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে ব্রিটিশ শাসনামলে লিখিত একটি রাজনৈতিক ও সাহসী উপন্যাস। যেটি ব্রিটিশ শাসিত ভারতে নিষিদ্ধ হয়েছিল।
পথের দাবী ধারাবাহিক ভাবে বঙ্গবাণী পত্রিকায় বের হত। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি ছিল পত্রিকার অফিস। পুলিশ কমিশনারের চিঠি ও নোট অনুযায়ী তদানিন্তন চিফ সেক্রেটারি পথের দাবীকে ‘বিষময়’ বলে উল্লেখ করেন। ১৯২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর এডভোকেট জেনারেল ব্রজেন্দ্রনাথ মিত্র মত দেন যে পথের দাবী দেশদ্রোহকর ও বাজেয়াপ্তযোগ্য। ১৯২৭ এর ৪ জানুয়ারি প্রকাশিত গেজেটে পথের দাবী নিষিদ্ধ হয়। সারা দেশ জুড়ে এই নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল। আইনসভাতে সুভাষচন্দ্র বসু ও হরেন্দ্রনাথ চৌধুরী প্রশ্ন তোলেন নিষিদ্ধকরণের যৌক্তিকতা নিয়ে।

বাণিজ্যের নাম দিয়া ধনীর ধনভাণ্ডার বিপুল হইতে বিপুলতর করিবার…. অবিরাম চেষ্টায় দুর্বলের সুখ গেল, শান্তি গেল, অন্ন গেল, ধর্ম গেল… তাহার বাঁচিবার পথ দিনের পর দিন সংকীর্ণ ও নিরন্তর বোঝা দুর্বিষহ হইয়া উঠিতেছে…এ সত্য তো কাহারও চক্ষু হইতেই গোপন রাখিববার জো নেই!”
— শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (পথের দাবী)

ধর্মঘট বলে একটা বস্তু আছে, কিন্তু নিরুপদ্রব-ধর্মঘট বলে কোথাও কিছু নেই। সংসারে কোন ধর্মঘটই কখনো সফল হয় না, যতক্ষণ না পিছনে তার বাহুবল থাকে। শেষ পরীক্ষা তাকেই দিতে হয়।
পথের দাবী – ২৫ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

“চিরদিন সংসারে অত্যাচারিত, পীড়িত, দুর্বল বলিয়া মানুষের সহজ অধিকার হইতে যাহারা সবলের দ্বারা প্রবঞ্চিত, নিজের উপরে বিশ্বাস করিবার কোন কারণ যাহারা দুনিয়ায় খুঁজিয়া পায় না, দেবতা ও দৈবের প্রতি তাহাদেরই বিশ্বাস সবচেয়ে বেশি।

❝সংসারে আশ্চর্য আছে বলেই তো মানুষের বাঁচা সম্ভব হয়ে ওঠেনা অপূর্ব বাবু। গাছের পাতার রঙ যে সবাই সবুজ দেখেনা এ তারা জানেও না। তবু যে লোকে তাকে সবুজ বলে, সংসারে এই কি কম আশ্চর্য।❞
__পথের দাবী

“বাঁধা গরু অনাহারে দাঁড়িয়ে মরতে দেখেছ? সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরে তবু সে জীর্ণ দড়িটা ছিঁড়ে ফেলে মনিবের শান্তি নষ্ট করেনা।”
~শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(পথের দাবী)

“যেখানে ফেলে যাওয়াই মঙ্গল সেখানে আঁকড়ে থাকাতেই অকল্যাণ।”
— শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (পথের দাবী)

“তোমাদের দেশের মেয়েরা নিজেদের ছোট মনে করে ছোট হয়ে যায় নি, তোমরাই তাদের মনে ক’রে দিয়েছো, নিজেরাও ছোট হয়ে গেছো।”
~শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সময়মত স্থান ত্যাগ করা এবং এ্যাকটিভিটি ত্যাগ করা এক বস্তু নয়।

“হৃদয়াবেগ দুর্মূল্য বস্তু, কিন্তু চৈতন্যকে আচ্ছন্ন করতে দিলে এতবড় শত্রু আর নেই।”
— (পথের দাবী) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

১০

মানুষের প্রতি মানুষে কত অত্যাচার করচে চোখ মেলে দেখতে শিখুন। কেবল ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে, নিজে সাধু হয়ে থেকে ভেবেচেন পুণ্য সঞ্চয় করে একদিন স্বর্গে যাবেন? মনেও করবেন না।—- এই নরককুণ্ডে যত পাপ জমা হবে তার ভার আপনাকে পর্যন্ত স্বর্গের দোর থেকে টেনে এনে এই নরককুণ্ডে ডোবাবে। সাধ্য কি আপনার এই দুষ্কৃতির ঋণশোধ না করে পরিত্রাণ পান!

১১

“কল্যাণ আমার কাম্য নয়, আমার কাম্য স্বাধীনতা।”
— পথের দাবী

১২

এরা যে পথের পথিক তাতে সহজ মানুষের সোজা হিসাবের সঙ্গে এদের হিসাব মেলে না।

১৩

কারও আচরণে তিক্ততাই যদি পেয়ে থাকেন, সমস্ত অনাগত কালের তাই শুধু সত্য হ’ল, আর অমৃত যদি কোথাও লাভ হয়ে থাকে, জীবনে তার কোন দাম দেবেন না?

১৪

পরাধীন দেশের সব চেয়ে বড় অভিসম্পাতই তো হলো কৃতঘ্নতা!যাদের সেবা করবে তারাই তোমাকে সন্দেহের চোখে দেখবে,প্রাণ যাদের বাঁচাবে তারাই তোমাকে বিক্রি করে দিতে চাইবে!মূঢ়তা আর অকৃতজ্ঞতা প্রতি পদক্ষেপে তোমায় ছুঁচের মত বিঁধবে।শ্রদ্ধা নেই,স্নেহ নেই,সহানুভূতি নেই,কেউ কাছে ডাকবে না,কেউ সাহায‍্য করতে আসবে না,বিষধর সাপের মত তোমাকে দেখে লোকে দূরে সরে যাবে। দেশকে ভালোবাসার এই আমাদের পুরস্কার,ভারতী, এর বেশী দাবী করবার যদি কিছু থাকে ত সে শুধু পরলোক।
~ পথের দাবী – শরৎচন্দ্র

১৫

যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জনপদ ভস্মসাৎ করে ফেলে, আয়তনে সে কতটুকু জানো? শহর যখন পোড়ে সে আপনার ইন্ধন আপনি সংগ্রহ করে দগ্ধ হয়। তার ছাই হবার উপকরণ তারই মধ্যে সঞ্চিত থাকে, বিশ্ববিধানের এ নিয়ম কোন রাজশক্তিই কোন দিন ব্যত্যয় করতে পারে না।
-পথের দাবী – ২৬ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

১৬

❝শ্রান্ত ও একান্ত নির্জীবের ন্যায় অপূর্ব কখন যে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল সে জানিতেও পারে নাই, তাহার ঘুম ভাঙ্গিল ভারতীর ডাকে। চোখ মুছিয়া বিছানায় উঠিয়া বসিয়া সম্মুখের ঘড়িতে চাহিয়া দেখিল রাত্রি বারোটা বাজিয়া গেছে। ভারতী পাশে দাঁড়াইয়া। অপূর্বর প্রথম দৃষ্টি পড়িল তাহার চুলের আয়তন ও দীর্ঘতার প্রতি। সদ্য-স্নান-সিক্ত বিপুল কেশভার ভিজিয়া যেমন নিবিড় কালো হইয়াছে, তেমনি ঝুলিয়া প্রায় মাটিতে পড়িয়াছে। স্নিগ্ধ সাবানের গন্ধে ঘরের সমস্ত রুদ্ধ বায়ু হঠাৎ যেন পুলকিত হইয়া উঠিয়াছে। পরনে একখানি কালপাড়ের সুতার শাড়ী, —গায়ে জামা না থাকায় বাহুর অনেকখানি দেখা যাইতেছে। ভারতীর এ যেন আর এক নূতন মূর্তি, অপূর্ব পূর্বে কখনো দেখে নাই। তাহার মুখ দিয়া প্রথমেই বাহির হইল, এত ভিজে চুল শুকোবে কি করে?❞
~শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ( পথের দাবী )

১৭

শান্তি! শান্তি! শান্তি! শুনে শুনে কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেছে। কিন্তু এ অসত্য এতদিন ধরে কারা প্রচার করেছে জানো? পরের শান্তি হরণ করে যারা পরের রাস্তা জুড়ে অট্টালিকা প্রাসাদ বানিয়ে বসে আছে তারাই এই মিথ্যামন্ত্রের ঋষি। বঞ্চিত, পীড়িত, উপদ্রুত নরনারীর কানে অবিশ্রান্ত এই মন্ত্র জপ করে করে তাদের এমন করে তুলেছে যে, আজ তারাই অশান্তির নামে চমকে উঠে, ভাবে এ বুঝি পাপ, এ বুঝি অমঙ্গল!… তাই ত আজ দীন-দরিদ্রের চলার পথ একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেছে।
— শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (পথের দাবী)

১৮

যে লোক দাবী করতে ভয় পায়, পরের দাবী মেটাতেই তার জীবন কাটে।

১৯

অপূর্ব ক্ষণকাল মনঃসংযোগ করিয়া বলিল, পথের-দাবী, তার মানে ?
ভারতী কহিল, ওই আমাদের সমিতির নাম ।ওই আমাদের মন্ত্র। ওই আমাদের সাধনা। আপনি আমাদের সভ্য হবেন।
অপূর্ব বলিল, আপনি নিজে একজন সভ্য নিশ্চয়ই, কিন্তু, কি আমাদের করতে হবে?
ভারতী বলিল, আমরা সবাই পথিক। মানুষের মনুষত্বের পথে চলবার সর্বপ্রকার দাবী অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙেচুরে চলবো। আমাদের পরে যারা আসবে তারা যেন নিরূপদ্রপে হাঁটতে পারে, তাদের অবাধ মুক্ত গতিকে কেউ যেন না রোধ করতে পারে, এই আমাদের পণ। আসবেন আমাদের দলে?

২০

তুমি ত আমাদের মত সোজা মানুষ নও,—তুমি দেশের জন্য সমস্ত দিয়াছ, তাই ত দেশের খেয়াতরী তোমাকে বহিতে পারে না, সাঁতার দিয়া তোমাকে পদ্মা পার হইতে হয়; তাই ত দেশের রাজপথ তোমার কাছে রুদ্ধ, দুর্গম পাহাড়–পর্বত তোমাকে ডিঙাইয়া চলিতে হয়;—কোন্‌ বিস্মৃত অতীতে তোমারই জন্য ত প্রথম শৃঙ্খল রচিত হইয়াছিল, কারাগার ত শুধু তোমাকে মনে করিয়াই প্রথম নির্মিত হইয়াছিল,—সেই ত তোমার গৌরব! তোমাকে অবহেলা করিবে সাধ্য কার! এই যে অগণিত প্রহরী, এই যে বিপুল সৈন্যভার, সে ত কেবল তোমারই জন্য! দুঃখের দুঃসহ গুরুভার বহিতে তুমি পারো বলিয়াই ত ভগবান এত বড় বোঝা তোমারই স্কন্ধে অর্পণ করিয়াছেন! মুক্তিপথের অগ্রদূত! পরাধীন দেশের হে রাজবিদ্রোহী! তোমাকে শতকোটী নমস্কার!
~ পথের দাবী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়