You are currently viewing ওমর খৈয়ামের কবিতা – ২০ টি নির্বাচিত ওমর খৈয়ামের কবিতা অনুবাদ

ওমর খৈয়ামের কবিতা – ২০ টি নির্বাচিত ওমর খৈয়ামের কবিতা অনুবাদ

ওমর খৈয়াম একজন ইরানের কবি, গণিতবেত্তা, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ।ইরানের নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করার পর যুবা বয়সে তিনি সমরখন্দে চলে যান এবং সেখানে শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এর পর বুখারায় নিজেকে মধ্যযুগের একজন প্রধান গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার বীজগণিতের গুরুত্বপূর্ণ “Treatise on Demonstration of Problems of Algebra“ গ্রন্থে তিনি ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের একটি পদ্ধতি বর্ণনা করেন। এই পদ্ধতিতে একটি পরাবৃত্তকে বৃত্তের ছেদক বানিয়ে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান করা হয়। ইসলামি বর্ষপঞ্জি সংস্কারেও তার অবদান রয়েছে।

তিনি তার কবিতা সমগ্র, যা ওমর খৈয়ামের রূবাইয়াত নামে পরিচিত, তার জন্য বিখ্যাত। কাব্য-প্রতিভার আড়ালে তাঁর গাণিতিক ও দার্শনিক ভূমিকা অনেকখানি ঢাকা পড়েছে। ধারণা করা হয় রনে দেকার্তের আগে তিনি বিশ্লেষণী জ্যামিতি আবিষ্কার করেন।তিনি স্বাধীনভাবে গণিতের দ্বিপদী উপপাদ্ আবিষ্কার করেন। বীজগণিতে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান তিনিই প্রথম করেন। বহুমুখী প্রতিভার দৃষ্টান্ত দিতে বলা হলে বিশ্বসাহিত্য কিংবা ইতিহাসে যাদের নাম উপেক্ষা করা কঠিন ওমর খৈয়াম তাদের মধ্যে অন্যতম ও শীর্ষস্থানীয়।
দর্শন ও শিক্ষকতায় ওমরের কাজ তার কবিতা ও বৈজ্ঞানিক কাজের আড়ালে অনেকখানি চাপা পড়েছে বলে মনে করা হয়। মধ্যযুগের মুসলিম মনীষা জামাকসারি ওমর খৈয়ামকে “বিশ্ব দার্শনিক” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অনেক সূত্রে জানা গেছে তিনি নিশাপুরে তিন দশক ধরে শিক্ষকতা করেছেন। ইরান ও পারস্যের বাইরে ওমরের একটি বড় পরিচয় কবি হিসাবে। এর কারণ তার কবিতা বা রুবাই এর অনুবাদ এবং তার প্রচারের কারণে। ইংরেজি ভাষী দেশগুলোতে এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা তবে, বহির্বিশ্বে খৈয়ামকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় করেন এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড। তিনি খৈয়ামের ছোট ছোট কবিতা বা রুবাই অনুবাদ করে তা রুবাইয়্যতে ওমর খৈয়াম নামে প্রকাশ করেইয়া এই লেখায় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের করা অনুবাদ গ্রন্থ থেকে বাছাই করা কিছু কবিতা তুলে ধরেছি। আশা করি এই কবিতাগুলো পাঠকদের ভালো লাগবে।


এক সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর

প্রিয় সাকি, তাহার সাথে একখানি বই কবিতার

জীর্ন আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ

এই যদি পাই চাইব না কো তখত আমি, শাহানশার !

কোরান-হাদিস সবাই বলে পবিত্র সে বেহেশ্ত নাকি,

মিলবে যেথায় আসল শরাব, তন্বী-হুরী ডাগর আঁখি।

শরাব এবং প্রিয়ায় নিয়ে দিন কাটে মোর দোষ তাতে কী?

এক নিশ্বাস প্রশ্বাসের এই দুনিয়া, রে ভাই, মদ চালাও !

কালকে তুমি দেখবে না আর আজ যে জীবন দেখতে পাও

খাম খেয়ালির সৃষ্টি এ ভাই, কালের হাতে লুটের মাল

তুমিও তোমার আপনাকে এই মদের নামে লুটিয়ে দাও !

 ৪

মদ পিও আর ফুর্তি করো- আমার সত্য আইন এই !

পাপ পুন্যের খোজ রাখি না- স্বতন্ত্র মোর ধর্ম সেই

ভাগ্য সাথে বিয়ের দিনে কইনু, “দিব কি যৌতুক?”

কইল বধূ “খুশি থেকো, তার বড় যৌতুক সে নেই !” 

হৃদয় যাদের অমর প্রেমের জ্যোর্তিধারায় দীপ্তিমান

মসজিদ মন্দির গির্জা, যথাই করুক অর্ঘ্য দান-

প্রেমের খাতায় থাকে লেখা অমর হয়ে তাদের নাম

স্বর্গের লোভ ও নরক-ভীতির উর্ধ্বে তারা মুক্ত-প্রান ।


আমার কাছে শোন উপদেশ- কাউকে কভু বলিসনে-

মিথ্যা ধরায় কাউকে প্রাণের বন্ধু মেনে চলিসনে

দুঃখ ব্যথায় টলিসনে তুই, খুজিসনে তার প্রতিষেধ

চাসনে ব্যথার সমব্যথী, শির উচু রাখ ঢলিসনে ।

প্রভাত হল । শরাব দিতে করব সতেজ হৃদয়পুর

যশোখ্যাতির ঠুনকো এ কাচ করব ভেঙে চাখনাচুর

অনেকদিনের সাধ ও আশা এক নিমিষে করব ত্যাগ

পরম প্রিয়ার বেনী বাধন, ধরব বেনুর বিধুর সুর ।


বল খৈয়াম, আলেমরা সব কেন এমন হয়,

ভুল ব্যখ্যা করে আমার নিয়ম সমুদয়;

কোথায় আমি বলেছি মদ নিষিদ্ধ সবার জন্য ?

এটি জ্ঞানীর জন্য সিদ্ধ, বোকার জন্য নয় ।

যদিও মদ নিষিদ্ধ ভাই, যত পার মদ চালাও,

তিনটি কথা স্মরন রেখে; কাহার সাথে মদ্য খাও?

মদ-পানের কি যোগ্য তুমি? কি মদই বা করছ পান?-

জ্ঞান পেকে না ঝুনো হ’লে মদ খেয়ো না এক ফোঁটাও।

১০

নগদ যা পাও হাত পেতে নাও,
 বাকির খাতা শূন্য থাক।
 দুরের বাদ্য লাভ কি শুনে,
 মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।

১১

বিদায় নিয়ে আগে যারা গেছে চলে, হে সাকি !

চির ঘুমে ঘুমায় তারা মাটির তলে, হে সাকি !

শারাব আনো আসল সত্য আমার কাছে যাও শুনে

তাদের যত তথ্য গেল হাওয়ায় গলে, হে সাকি !

১২

মুগ্ধ করো নিখিল হৃদয় প্রেম নিবেদন কৌশলে

হৃদয়-জয়ী হে বীর, উড়াও নিশান প্রিয়ার অঞ্চলে !

এক হৃদয়ের সমান নহে মসজিদ আর কাবা

কি হবে তোর তীর্থে ‘কাবা’র, শান্তি খোজ হৃদয়-তলে ।


১৩

শারাব নিয়ে বসো, ইহাই মহমুদেরই সুলতানৎ

দাউদ নবীর শিরিন-স্বর ঐ বেনু বীণার মধুর গৎ

লুট করে নে আজের মধু, পূর্ন হবে মনস্কাম

আজকে পেয়ে ভুলে যা তুই অতীত আর ভবিষ্যৎ ।


১৪

তত্ত্ব-গুরু খৈয়ামেরে পৌঁছে দিও মোর আশিস

ওর মত লোক বুঝলো কিনা উলটো ক’রে মোর হাদিস !

কোথায় আমি বলেছি যে, সবার তরেই মদ হারাম?

জ্ঞানীর তরে অমৃত এ, বোকার তরে উহাই বিষ।


১৫

দোষ দেয় আর ভর্ৎসে সবাই আমার পাপের নাম নিয়া

আমার দেবী প্রতিমারে পূজি তবু প্রান দিয়া

মরতে যদি হয় গো আমার শারাব পানের মজলিশে-

স্বর্গ নরক সমান, পাশে থাকবে শারাব আর প্রিয়া ।


১৬

সকল গোপন তত্ত্ব জেনেও পার্থিব এই আবহাওয়ার

মিথ্যা ভয়ের ভয় গেলো না? নিত্য ভয়ের হও শিকার?

জানি স্বাধীন ইচ্ছামত যায় না চলা এই ধরায়,

যতটুকু সময় তবু পাও হাতে, লও সুযোগ তায় ।

১৭

বিধর্মীদের ধর্মপথে আসতে লাগে এক নিমেষ

সন্দেহেরই বিপথ-ফেরত বিবেক জাগে এক নিমেষ

দুর্লভ এই নিমেষটুকু ভোগ করে নাও প্রান ভরে

এই ক্ষনিকের আয়েশ দিয়ে জীবন ভাসে এক নিমেষ ।


১৮

ঘুমিয়ে কেন জীবন কাটাস? কইল ঋষি স্বপ্নে মোর

আনন্দ-গুল প্রস্ফুটিত করতে পারে ঘুম কি তোর?

ঘুম মৃত্যুর জমজ ভ্রাতা, তার সাথে ভাব করিসনে

ঘুম দিতে ঢের পাবি সময় কবরে তোর জনম ভোর । 

১৯

প্রেমের চোখে সুন্দর সেই হোক কালো কি গৌর-বরন

পরুক ওড়না রেশমি কিংবা পরুক জীর্ন দীন বসন

থাকুক শুয়ে ধুলায় সে কি থাকুক সোনার পালঙ্কে

নরকে সে গেলেও প্রেমিক করবে সেথায় অন্বেষন । 

২০

এইখানে এই তরুতলে,

তোমার আমার কৌতুহলে

এ জীবনের আর কটাদিন

কাটিয়ে দিব প্রিয়ে

সংগে রবে সুরার পাত্র

একটু খানি আহার মাত্র,

আর এক খানি ছন্দমধুর কাব্য হাতে নিযে।

থাকবে তুমি আমার পাশে,

গাইবে সখী প্রেমোচ্ছাসে,

মরুর মাঝে স্বপ্ন স্বরূপ করবে বিচরন,

গহন কানন হবে লো সই নন্দনেরই বন………।

২১

নিদ্রা যেতে হবে গোরে অনন্তকাল, মদ পিও

থাকবে না কো সাথী সেথায় বন্ধু প্রিয় আত্মীয়

আবার বলতে আসবো না ভাই, বলছি যা তা রাখ শুনে-

ঝরেছে যে ফুলের মুকুল, ফুটতে পারে আর কি ও?

২২

মরুর বুকে বসাও মেলা, উপনিবেশ আনন্দের

একটি হৃদয় খুশি করা তাহার চেয়ে মহৎ ঢের

প্রেমের শিকল পরিয়ে যদি বাধতে পার একটি প্রান-

হাজার বন্দী মুক্ত করার চেয়েও অধিক পুন্য এর ।


২৩

বিষাদের ঐ সওদা নিয়ে বেড়িয়ো না ভাই শিরোপরি

আঙুর-কন্যা সুরার সাথে প্রেম করে যাও প্রান ভরি

নিষিদ্ধ ঐ কন্যা, তবু হোক সে যতই অ-সতী

তাহার সতী মায়ের চেয়ে ঢের বেশী সে সুন্দরী ।

Author

  • "শীতের চরম শিখরে আমি অবশেষে আবিষ্কার করলাম যে আমার ভেতরে এক অপরাজেয় গ্রীষ্ম বাস করে।"

    — আলবার্ট কামুস

    View all posts