You are currently viewing আষাঢ়ের এক রাতে – হালিমা খাতুন

আষাঢ়ের এক রাতে – হালিমা খাতুন

আষাঢ়ের এক রাতে
— হালিমা খাতুন

 

একবার দাদার সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে আবু বিশাল একটা বোয়াল মাছ ধরেছিল। তখন ছিল আষাঢ় মাস। ঝরঝর বৃষ্টি পড়ছিল থেকে থেকে। আর বিদ্যুতের ঝলক আকাশের ওপরে সোনার দাগ কেটে পালিয়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। যাবার সময় মেঘের আড়াল থেকে তবলার শব্দ শুনিয়ে দিচ্ছিল। আবুর যে বয়স, তাতে তার ঘন বর্ষার রাতে মৌরিবিলে মাছ ধরতে যাবার কথা নয়। কারণ বয়স তার মোটে দশ। বড়ো ভাইয়েরা তাকে কোনো সময় সঙ্গে নিতে চায় না। বোয়াল মাছ ধরার দিনও দাদা সাজেদ ও তার বন্ধুরা একেবারেই জানতে পারেনি যে ছোট্ট আবু তাদের সঙ্গে যাচ্ছে। বলে-কয়ে যেতে চাইলে দাদারা ওকে সঙ্গে নেবে না। তাই বেচারা আবু চুপিচুপি গিয়ে নৌকার খোলের মধ্যে ঢুকে লুকিয়ে ছিল এবং সেখানে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

বর্ষাকাল মানে আষাঢ় এলেই মৌরিবিলে প্রচুর মাছ পড়ে। বোয়াল, পাঙ্গাস থেকে শুরু করে ট্যাংরা, পুঁটি, পারশে, বেলে সবই পাওয়া যেত। আবুর বড়ো ভাই সাজেদের মাছ ধরার নেশা খুব। অনেকবার সে বড়ো বড়ো মাছ ধরেছে। এবারও দুই বন্ধু বিপুল আর বায়েজিদকে নিয়ে সে মাছ ধরার প্ল্যান করেছিল। তারপর সব গোছগাছ করে বাড়ির নৌকাটা নিয়ে মৌরিবিলের পথে রওনা হলো। সঙ্গে নিল কয়েক রকম জাল, হারিকেন, মাছ আনার বড়ো বড়ো ‘খালুই’। আর নিল রাতের খাবার। নৌকা বাইবে কিষান তিনু। দরকার হলে এরাও হাত লাগাবে। অতিরিক্ত দুটো বৈঠাও সঙ্গে করে নিল তারা।

ওদিকে আবু ছটফট করছে কী করে সে ওদের সঙ্গে যাবে। বিপুল ও বায়েজিদকে নিয়ে সাজেদ যখন নৌকায় মৌরিবিলে যাবার পাকাপাকি প্ল্যান করছিল, তখন আবু শুনে মনে মনে ঠিক করে ফেলল যে সে ওদের সঙ্গে যাবে। তাতে যা হয় হবে। আবুর এই গোপন প্ল্যান সাজেদরা কিছুই জানতে পারেনি। আকাশে মেঘ। তাই তারা সন্ধ্যার আগেই বেরিয়ে পড়ল। মাছ ধরা হবে রাতে। হারিকেনের আলো দেখলে মাছেরা কেমন যেন রাতকানা হয়ে যায়। তখন মাছশিকারিরা জাল দিয়ে ধরে ফেলে সেই পথভোলা মাছগুলোকে।

কিছুদূর যাবার পর ঝরঝর করে বৃষ্টি নামল। ওরা তিনজন ছাতা মাথায় দিল। মাথাল মাথায় তিনু নৌকার হাল ধরে বসে রইল। সন্ধ্যা হলো। বৃষ্টি থামল। হারিকেন জ্বালাল ওরা। একটু পরেই হারিকেন নিবুনিবু হয়ে এল। সাজেদ হারিকেনটা নাড়িয়ে দেখে তেল নেই একটুও তাতে। নৌকার খোলের মধ্যে কেরোসিন তেলের বোতল। পাটাতনের তক্তা তুলে দেখে সেখানে ছোটো মতো কে যেন শুয়ে আছে। সাজেদ চেঁচিয়ে উঠল-

: এই বিপুল! এই বায়েজিদ! দ্যাখ, এখানে কে যেন শুয়ে আছে।

: কে আবার নৌকার খোলের মধ্যে শুতে যাবে। বোধহয় ধানের বস্তা। কিষানেরা নামাতে ভুলে গেছে।

‘না, বস্তা না। এই কে তুই? কে? কে?’- বলে সাজেদ শোয়া ব্যক্তিকে ঠেলা দিল।

আবু তখন হুড়মুড় করে উঠে বসে চোখ ডলতে ডলতে বলল, ‘আমি আবু।’ বলেই সে কেঁদে দিল। সাজেদ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘আবু তুই এখানে কী করে এলি? আজ তোকে পিটিয়ে ঠান্ডা করব। কাউকে না-বলে চলে এসেছিস। বাড়িতে সবাই তো কান্নাকাটি শুরু করেছে। তাহলে তো মাছ ধরা যাবে না। বাড়ি ফিরে যেতে হবে।’ আবু তখন কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘দাদা মেরো না আমাকে। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তোমাদের সাথে এসেছি মাছ

ধরার জন্য। তবে কালুকে বলে এসেছি কেউ খুঁজলে বলে দিতে।’

: ভালো কথা। বুদ্ধির কাজ করেছিস। তা পুঁচকে ছেলে তুই কী মাছ ধরবি?

: বড়ো মাছ ধরব দাদা।

: বেশ থাক। বড়ো মাছ তোকেই ধরে না নিয়ে যায় দেখিস। দাদার আশ্বাস পেয়ে আবু মনের সুখে গান ধরল। সাজেদ শুনে বলল, ‘তুই বরং পাটাতনের নিচে তোর জায়গায় গিয়ে ঘুমিয়ে থাক। মাছ এসে তোকে ডেকে তুলবে।’

: না আমি ঘুমাব না। বড়ো মাছ ধরব। তোমরা মাছ ধরবে আর আমি ঘুমিয়ে থাকব, তা হবে না! তা হবে না!

: তা তুই মাছ কী দিয়ে ধরবি?

: আমি বড়শি আর টোপ নিয়ে এসেছি।

আবু তখন তার পুঁটলি থেকে বড়শি আর টোপ বের করে দেখাল। তা দেখে সাজেদ ও তার বন্ধুরা হেসেই গড়াগড়ি। এমন অদ্ভুত বড়শি আর টোপ তারা কখনও দেখেনি। সাজেদ বলল-

: ও, এই তোর বড়শি, কেরোসিনের টিনের আংটা দিয়ে বানানো! এ দিয়ে মাছ কেন কুমিরও ধরতে পারবি। জলহস্তী তো আমাদের দেশে নেই। থাকলে তা-ও তোর এই বড়শি দিয়ে ধরতে পারতিস। তা দেখি তোর টোপ। ও, তেলাপোকা। মাছ কি তেলাপোকা খায়?

: খায় খায়, আমি জানি।

: ঠিক আছে তুই নৌকায় বসে কুমির, জলহস্তী যা খুশি ধর। আমরা পানিতে নেমে জাল ফেলব। দেখিস ঘুমিয়ে পড়িস না যেন। আর তিনু ভাই তুমি ওকে দেখ। আমরা চললাম। দেরি হয়ে গেল অনেক। আর দেরি করলে মাছ পাওয়া যাবে না। তোর জন্য খালি খালি সময় নষ্ট হলো। বলেকয়ে এলে কী হতো?

আবু কোনো জবাব না-দিয়ে চুপ করে রইল। একা নৌকায় থাকতে পেরে আবুর খুব আনন্দ হলো। সে তাড়াতাড়ি মাছ ধরার সরঞ্জাম বের করল। তার দুটো বড়শিতে তেলাপোকার টোপ গেঁথে পানিতে ছুড়ে দিল। তারপর বড়শির দড়ি নৌকার গলুইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে বেঁধে বসে রইল। অন্ধকার চারদিক। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।

আবুর মনে খালি একটাই ভয়। বড়শিতে মাছ ধরা পড়বে কি না। এত কষ্ট করে লুকিয়ে এসে যদি মাছ না-পায় তাহলে তো সবাই খেপাবে। বড়শির দড়ির সঙ্গে কয়েকটা জোনাকি পলিথিনের থলের মধ্যে ভরে ফাতনার মতো বেঁধে দিয়েছিল। সেই জোনাকি ফাতনার দিকে সে চেয়ে বসে ছিল। সুবোধ কাকার কাছে সে শুনেছিল যে বোয়াল মাছ তেলাপোকা ভালোবাসে। তাই সে তেলাপোকার টোপ দিয়ে পাঁচটা চিতল মাছ ধরেছিল। সে অবশ্য অনেকদিন আগের কথা। আবু ভাবতে লাগল মাছের কথা। এমন সময় সে দেখল, ফাতনাটা শাঁ করে পানির মধ্যে ডুবে গেল। সে তাড়াতাড়ি গলুইয়ের সঙ্গে বাঁধা বড়শির দড়ি ছাড়তে লাগল। ছাড়তে ছাড়তে দড়ি প্রায় শেষ হয়ে গেল। তারপর সে দড়ি টেনে টেনে আবার গলুইয়ের সঙ্গে জড়াতে লাগল। প্রথমে দড়িতে ভার লাগল না। তার মনটাই দমে গেল। কিন্তু একটু পরেই দড়িতে ভার বোধ হতে লাগল আর খুব টানাটানি শুরু হয়ে গেল। এমন সময় বৃষ্টি নামল।

তিনু হাল ধরে বসে ছিল। আবু তিনুকে প্রাণপণে ডাকতে লাগল, তিনু ভাই তিনু ভাই। বড়ো মাছ, শিগগির আস।

তিনু বলল-

: ধুর পাগল। এই বিলে বড়ো মাছ কোথা থেকে আসবে। খাল, বিল তো এখন মরেই গেছে। আগের দিন হলে

কথা ছিল।

: না বড়ো মাছ ধরেছি। তুমি এসো তিনু ভাই। আমার হাত কেটে যাচ্ছে।

তিনু তখন এগিয়ে এসে বড়শির দড়ি ধরল। তারা দুজনে ধরে দড়ি জড়াতে লাগল হালের খুঁটির সঙ্গে। জড়াতে জড়াতে ওরা দুজন একদম ক্লান্ত হয়ে গেল। বৃষ্টি তখনও ঝরছে। ওরা ভিজে একাকার। কিন্তু সেদিকে খেয়াল না-করে ওরা বড়শির দড়ি টেনে যেতে লাগল। টানতে টানতে শেষে একটা হ্যাঁচকা টান দিতে বড়ো কী যেন একটা নৌকার খোলের মধ্যে দড়াম করে এসে পড়ল। আর এলোপাথাড়ি লাফালাফি করতে লাগল।

তাতে নৌকা প্রায় ডুবে যাবার মতো হলো। জোরে বিদ্যুৎ চমকাল। ওরা সেই আলোতেই দেখল, বড়ো আকারের একটা বোয়াল মাছ, প্রায় আবুর সমান। বোয়াল লাফাতে লাগল। তিনু তখন খোলের তলা থেকে একটা বস্তা এনে বোয়ালের গায়ে চাপা দিল। খানিকক্ষণ ধস্তাধস্তি করে বোয়াল শান্ত হলো। আবুর খুশির নাচ তখন কে দেখে!

এমন সময় সাজেদরা ফিরে এল। আজ তাদের জালে পুঁটি ছাড়া কিছুই ধরা পড়েনি। তাই রাগ করে তারা তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। এসেই দেখে, আবুর বিশাল বোয়াল। দেখে তাদের বিশ্বাস হতে চায় না। সাজেদ বলল, ‘এই আবু, অত বড়ো বোয়াল কোথা থেকে এল?’ আবু বলল, ‘পানি থেকে। আর আমি ধরেছি!’

Author

  • "শীতের চরম শিখরে আমি অবশেষে আবিষ্কার করলাম যে আমার ভেতরে এক অপরাজেয় গ্রীষ্ম বাস করে।"

    — আলবার্ট কামুস

    View all posts