অতিথি
হোমার
রূপান্তর: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
অডিসিয়ুস নগরে ঢুকেছেন। তখন রাত নেমেছে এই অজানা নগরে। পদে পদে তাঁর দুশ্চিন্তা। পথে একটি মেয়েকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘এই যে মেয়ে, শোনো, আমি এদেশের লোক নই। বাইরে থেকে এসেছি। কাউকে চিনি না এখানকার। আমি রাজবাড়ি যাব। বলে দেবে কি তার পথটা কোনদিকে?’
মেয়েটির বাড়ি রাজবাড়ির কাছেই। তার স্বভাবটি ভারি মিষ্টি। সে বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন। দেখিয়ে দেবো। কিন্তু আপনি যে বিদেশি তা কাউকে আর বুঝতে দেবেন না। কারো সঙ্গে কথা বলবেন না। বিদেশিদের আমরা বড়ো একটা পছন্দ করি না।’ অডিসিয়ুস বুঝলেন এ মেয়ে খুব বুদ্ধিমতী। কোনো কথা না বলে তিনি চললেন ওর পিছু পিছু।
অডিসিয়ুস দেখলেন, নগরটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রাচীরের ওপরে জাহাজের মাস্তুল সব দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
কিছুদূর গিয়েই দেখেন, চোখের সামনে জেগে উঠেছে রাজবাড়ি। দেখলেন, চমৎকার এক দৃশ্য। দূর থেকেই চোখে পড়ল রাজবাড়ির সামনের সারি সারি ফলের গাছ। ডালিমের, আপেলের, নাশপাতির, ডুমুরের, জলপাইয়ের। এখানে ফল মনে হয়, কখনো শেষ হবে না। আসলে তাই। সেসব গাছের এক দল ফল দেয় গ্রীষ্মকালে, আরেক দল শীতে। সারা বছর ধরেই ফুল ফুটছে, ফল পাকছে। লতিয়ে উঠেছে আঙুরলতা। থোকা থোকা ঝুলছে আঙুর। এক দিক দিয়ে পাকে আরেক দিক দিয়ে ফলে। তরকারিরও চাষ আছে দেখলেন অডিসিয়স। সবুজেরা যেন আপন মনে খেলছে। মাঠের দুপাশে দুটো ঝরনা। একটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে মাঠের মধ্য দিয়ে। অন্যটি সারা শহরের লোকদের পানির জোগান দেওয়া শেষ করে এখন এসে যেন বিশ্রাম নিচ্ছে রাজবাড়ির কাছে। নিজে না দেখলে সেই দৃশ্যের বর্ণনা দেয়াও কঠিন।
অডিসিফুস দেখলেন যে রাজপ্রাসাদের দরজাগুলো সোনা দিয়ে তৈরি। দরজার কাঠামো কাঠের নয়, রুপার। হাতলগুলো সোনার। এগিয়ে দেখেন ভেতরে অনেকগুলো কুকুর, কোনোটি সোনার, কোনোটি রুপার, যেন পাহারা দিচ্ছে সবাই মিলে। ভেতরে ঢুকতেই চোখ পড়ল দেয়ালের পাশে উঁচু উঁচু সব আসন বসানো। প্রতিটি ঢাকা অতি সুন্দর কাপড়ে। রাজবাড়ির মেয়েরা সবাই কাজ করে। কেউ শস্য ভাঙে খুব মিহি করে। কেউ-বা তাঁত বোনে, কেউ কাটে সুতা। এই দেশে ছেলেদের দক্ষতা যেমন জাহাজ চালানোতে, মেয়েদের দক্ষতা তেমনি গৃহকাজে। এর মধ্য দিয়ে অডিসিফুস ঢিপঢিপ করা বুকে এগিয়ে এলেন সামনে। দেখেন, সোনার তৈরি যুবকেরা সব মশাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সব খেতে বসেছেন একসঙ্গে। সিংহাসন দেখে অডিসিয়ুস রাজাকে চিনলেন, চেহারা দেখে রানিকে। সোজা চলে গেলেন সেদিকেই। রাজাকে পার হয়ে রানির সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে হাত ধরলেন রানির।
হঠাৎ এমন একটা ঘটনা দেখে থ-মেরে গেছে সবাই। কারো মুখে রা নেই। কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে অডিসিয়সই শুরু করে দিলেন তাঁর নিজের কথা। বললেন, ‘মহারানি, দয়া করে আমার কথাটি শুনুন। আমি এসেছি আপনাদের কাছে সাহায্য চাইতে। আপনার অতিথিদের কাছেও আমার একই আবেদন। আমি দেশছাড়া পথহারা এক পথিক। আমার প্রার্থনা, আপনারা আমাকে আমার দেশে পাঠিয়ে দেবার একটা ব্যবস্থা করুন।’
আবেদন শেষে রাজা-রানির সামনে ওই মেঝের ওপরেই বসে পড়লেন অডিসিয়ুস। দেখা গেল, কেউই কোনো কথা বলছেন না। বোধ করি বিস্ময় কাটছে না তাঁদের। শেষে একজন কথা বললেন। বয়সে বৃদ্ধ তিনি, ধনী জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতায়। কথা বলেন চমৎকার। তিনি বললেন, ‘রাজা আলসিনৌস, এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। ইনি আগন্তুক, ধুলোতে বসে আছেন। আপনার উচিত একে উঠে বসতে বলা। এঁর জন্য খাবার আনতে হুকুম করা। আমরা সবাই তো অপেক্ষা করে আছি আপনি কী বলেন সেটা শোনার জন্য।’
আলসিনৌসের তখন খেয়াল হলো। অডিসিয়ুসকে হাত ধরে তুললেন তিনি। রুপার তৈরি আসনে বসতে দিলেন তাঁকে। রাজপুত্রদের একজন উঠে গেল রাজার ইশারায়, সেই আসনেই বসলেন অডিসিয়ুস। হাত ধোয়ার পাত্র এল। টেবিল এল সামনে। তারপর এল অত্যন্ত সুস্বাদু সব খাবার। রাজা বললেন, ‘আপনারা সবাই ফিসিয়ানদের চালক ও পরামর্শদাতা। রাত তো এখন অনেক হয়েছে। খাওয়া দাওয়াও শেষ হয়েছে আমাদের। আজ এ-পর্যন্তই থাক। কাল সকালে বরং আমরা আবার মিলিত হব। তখন ঠিক করা যাবে এই অতিথির জন্য আমরা কী করতে পারি। জানি না, এঁর দেশ কোথায়, কত দূরে। যেখানেই হোক, যত দূরেই হোক, যাতে তিনি সহজে, নিরাপদে দেশে পৌঁছতে পারেন তার ব্যবস্থা অবশ্যই করা যাবে। আমরা ব্যবস্থা করব, সঙ্গে লোকও দেবো। এঁকে নিজের দেশে পৌঁছে দেবো। তবে আর একটা কথা। এমনও তো হতে পারে যে, ইনি আদপে মানুষই নন। মানুষের ছদ্মবেশ ধরে এসেছেন।
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন অডিসিয়ুস, ‘ধন্যবাদ মহারাজ, ওই একটা বিষয়ে আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি। আমি মানুষই। ছদ্মবেশী দেবতা নই। আমার দুঃখের লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে আমি আপনাদের বিরক্ত করতে চাই না। কষ্টে কষ্টে আমার হৃদয় শক্ত পাথর হয়ে যাওয়ার কথা। তবু ওই যে আপনাদের সামনে খাবার খেলাম অমন গপগপ করে, সে শুধু এই জন্যই যে আমি মানুষ, আর মানুষের পক্ষে ক্ষুধার চেয়ে বড়ো কোনো মুনিব নেই। প্রার্থনা এখন আমার কেবল একটাই, কাল সকালেই আপনাদের এই ভাগ্যাহত অতিথির যাত্রার ব্যবস্থাটা করুন। এখন একটি মাত্র ইচ্ছাই শুধু বেঁচে আছে; দেশের মাটিতে, আপনজনের মাঝখানে যেন আমি মরতে পারি। ব্যস আর কিছু নয়।’
অডিসিয়ুসের কথা বিফলে গেল না। মনে হলো খুশি হয়েছেন সবাই। একবাক্যে সবাই মিলে রায় দিলেন যে এঁকে স্বদেশে পাঠানোই ঠিক। তারপর তাঁরা বিদায় নিলেন পরস্পরের কাছ থেকে। চলে গেলেন যে যাঁর বাড়ি। রইলেন শুধু রাজা আলসিনৌস আর রানি এরিতি এবং তাঁদের সঙ্গে বসে সাহায্যপ্রার্থী অডিসিফুস। নারী গৃহকর্মীরা খাবারের পাত্রগুলো সরিয়ে নিচ্ছিল। এঁরা তিনজন কথা বলছিলেন।
রানিই প্রথমে বললেন কথা। অডিসিয়ুসের গায়ে তিনি তাঁর পরিচিত জামা কাপড় দেখে ভারি অবাক হয়েছেন। সেজন্য সরাসরিই প্রশ্ন করলেন তিনি। বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, আমি সরাসরিই জিজ্ঞেস করছি আপনাকে। আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? গায়ের জামা কাপড়গুলোই-বা পেলেন কোথায়? আপনি না বললেন যে আপনি এখানে এসেছেন ঘটনাচক্রে?’
সতর্কভাবে তখন জবাব দিলেন অডিসিয়ুস। বললেন আপন কাহিনি। ‘মহারানি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার কাহিনি একটানা দুর্ভোগেরই কাহিনি। সেটা শুনতে গেলে আপনি বিরক্ত হবেন। সংক্ষেপে আমি আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। ওই যে সমুদ্র আপনাদের দেশকে ঘিরে রেখেছে, ওই সমুদ্রেরই এক অজানা কোণে দ্বীপ আছে একটি। সেখানে জনপ্রাণী নেই, আছেন কেবল কেলিপসো। দেবী তিনি, সৌন্দর্যে তুলনাবিহীন। কিন্তু অন্যদিকে আবার ভীষণ ভয়ংকর। তাঁর ভয়ে সে দ্বীপে মানুষ তো ঘেঁষেই না, দেবতারাও পা দেন না। অথচ এমনি কপাল আমার যে সেই দ্বীপে গিয়েই আছড়ে পড়েছিলাম আমি। না, কোনো সঙ্গী ছিল না আমার। সঙ্গী যাঁরা ছিলেন, একসঙ্গে জাহাজে ছিলাম যাঁদের সঙ্গে, তাঁরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। মাঝ সমুদ্রে বজ্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল জাহাজ। কেবল আমিই বাঁচলাম, কোনোমতে। তক্তা ধরে ভাসতে ভাসতে নয় দিন পর দশ দিনের দিন রাতের বেলা অন্ধকারে আছড়ে গিয়ে পড়েছিলাম ওই দ্বীপে। সেই অনিন্দ্যসুন্দর দেবী আমাকে তুলে নিলেন। যত্ন করলেন। এ-ও বললেন যে, অমরতা দেবেন আমাকে, আমার আর বয়স বাড়বে না কোনোদিনই। কিন্তু একদিনের জন্য কেন, এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে কোনো শান্তি ছিল না। আমি আমার দেশকে ভুলতে পারিনি। সাত বছর ছিলাম সেই দ্বীপে। আমার চোখের পানি আকাশ দেখত, বাতাস দেখত। আর সেই পানিতে কাপড় ভিজত।
‘অষ্টম বছরে কেন জানি না দেবীর হঠাৎ দয়া হলো। তিনি বললেন, যেতে দেবেন। নিজের হাতে নৌকা তৈরি করলাম আমি। তিনি সঙ্গে দিলেন প্রচুর পরিমাণে খাবার, আর কোনোকালেই ধ্বংস হবে না এমন জামাকাপড়। বাতাস দিলেন অনুকূল। রওনা তো হলাম। সতেরো দিন সমানে চলল নৌকা। আঠারো দিনের দিন দূরে দেখলাম, ছায়ার মতো ভেসে উঠেছে আপনাদের পাহাড়-পর্বতগুলো। আমার খুশি তখন দেখে কে। কিন্তু হায়, সেই হাসিখুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ দেখি ঝড় উঠেছে, আর সেই সঙ্গে উতলা হয়ে উঠেছে সমুদ্র। কী করব ঠিক করতে পারছি না। এমন কী ঘটেছে সেটা বুঝে ওঠার আগেই চোখের সামনে দেখলাম, নৌকাটা ভেঙে একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তবু পানিতে মাছের মতো সাঁতরে কোনোমতে বেঁচে রইলাম। তারপর বাতাস ও স্রোতের মুখে চলে এসেছি আপনাদের তটভূমিতে। কিন্তু পাড়ে উঠবার চেষ্টা করে দেখি-না, সে উপায় নেই। তাই আবারও সাঁতরাতে থাকলাম। শেষে একটা নদীর মুখ পেয়ে সেখানে ঢুকে ওঠার মতো জায়গা পেলাম একটু। জায়গাটা পাহাড়ি নয়, বাতাস যে আক্রমণ করবে তেমনও নয়।
‘কোনোমতে পাড়ে উঠে আশ্রয় খুঁজলাম। এরই মধ্যে রাত এল নেমে। একটা ঝোপের ভেতর ঢুকে এলিয়ে দিলাম শরীর। সারা রাত অজ্ঞানের মতো ঘুমিয়ে, অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠেছি। সত্যি কথা বলতে কি, সূর্য তখন ওঠার দিকে নয় ডোবার দিকেই বরং। ঘুম ভাঙলে দেখি রাজ কন্যার সঙ্গিনীরা বল নিয়ে ছোটাছুটি করে খেলছেন। স্বয়ং রাজকন্যাও আছেন তাদের সঙ্গে। রাজকন্যাকে দেখে তো প্রথমে মনে হয়েছিল কোনো দেবীকে দেখছি বুঝি। তাঁর কাছেই আবেদন করেছিলাম সাহায্যের জন্য। চমৎকার বিচক্ষণতা তাঁর। তিনি খাবার দিয়েছেন, জামা কাপড় দিয়েছেন। এই হলো বৃত্তান্ত আমার।’
রাজা আলসিনৌস বললেন, ‘রাজকন্যা যা করেছে ঠিকই করেছে, তবে অপরাধ করেছে একটা। তার উচিত ছিল আপনাকে সরাসরি রাজবাড়িতেই নিয়ে আসা। সর্বপ্রথম তার কাছেই তো আপনি সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন।’ অডিসিয়ুস বললেন, ‘মহারাজ, সেটা আপনার মেয়ের দোষ নয়। আমি নিজেও রাজি হতাম না সরাসরি আপনার কাছে আসতে। আমার ভয়, ছিল আপনি হয়তো খুশি হবেন না আমাকে দেখে।’ রাজা শুনে হাসলেন। বললেন, ‘এসব সামান্য ব্যাপারে আমরা রাগ করি না। আমি দেখছি স্বভাবের দিক থেকে আপনার সঙ্গে আমাদের গরমিল নেই। আপনি ইচ্ছে করলে স্বাচ্ছন্দ্যে আমাদের এখানে থাকতে পারেন। আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি হবে না। আর যদি মনে করেন চলে যাবেন তাতেও আমরা কেউ বাধা দেবো না। আপনার দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য আমি কী বলি শুনুন। আমি বলি, আপনি যদি চান কাল সকালেই রওনা হতে পারেন। আপনি জাহাজে যাবেন। আমাদের সুদক্ষ নাবিকেরা টানবে তার দাঁড়। ঘুমাতে ঘুমাতে চলে যাবেন। দূরত্বের প্রশ্ন নেই। সমুদ্রের শেষ প্রান্তেও যদি হয় আপনার দেশ, তবু আপত্তি নেই আমাদের। আমরা পৌঁছে দেবো আপনাকে। আপনি দেখবেন আমাদের নাবিকদের দক্ষতা।’
ধৈর্য ধরে শোনেন অডিসিয়স। তাঁর বুক ভরে ওঠে আশায়। কথাবার্তা যখন চলছিল তারই ফাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রানি এরিতি। গৃহকর্মীরা লেগে গিয়েছিল কাজে। মশাল হাতে নিঃশব্দ তৎপরতা তাদের। সুন্দর খাট এনে বিছিয়ে দিল একটা। ভারী বিছানা দিল পেতে। ওপরে পাড়ল চাদর। এনে রাখল গরম কম্বল। সব কাজ শেষ হলে অডিসিয়ুসের কাছে এসে বলল তারা, ‘আপনার বিছানা তৈরি। ইচ্ছা করলে ঘুমুতে পারেন।’ আর তখুনি বুঝলেন অডিসিয়ুস, ঘুমানো তাঁর জন্য কী ভীষণ প্রয়োজন।
এতসব বিপদ ও উদ্বেগের শেষে রাতের বেলা নিশ্চিন্তে, আরামে ঘুমালেন তিনি।
