ঝরনার গান কবিতা — সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
চপল পায় কেবল ধাই, কেবল গাই পরীর গান, পুলক মোর সকল গায়, বিভোল মোর সকল প্রাণ। শিথিল সব শিলার পর চরণ থুই দোদুল মন, দুপুর-ভোর ঝিঁঝির ডাক, ঝিমায় পথ, ঘুমায় বন।
চপল পায় কেবল ধাই, কেবল গাই পরীর গান, পুলক মোর সকল গায়, বিভোল মোর সকল প্রাণ। শিথিল সব শিলার পর চরণ থুই দোদুল মন, দুপুর-ভোর ঝিঁঝির ডাক, ঝিমায় পথ, ঘুমায় বন।
পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী! আস্তে একটু চল না ঠাকুরঝি— ওমা, এ যে ঝরা-বকুল! নয়? তাইতো বলি, বসে দোরের পাশে, রাত্তিরে কাল- মধুমদির বাসে আকাশ-পাতাল- কতই মনে হয়।
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে। সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে॥ জানি নে তোর ধন রতন আছে কি না রানির মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।॥
কহিলা হবু, 'শুন গো গোবুরায়, কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র— মলিন ধুলা লাগিবে কেন পায় ধরণী-মাঝে চরণ-ফেলা মাত্র! তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি, রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি। আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি, রাজ্যে মোর একি এ অনাসৃষ্টি! শীঘ্র এর করিবে প্রতিকার, নহিলে কারো রক্ষা নাহি আর।'
এবার মোছাব মুখ তোমার আপন পতাকায়। হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখভোলানিয়া গান গায়। মোছাব তোমার মুখ আজ সেই গাঢ় পতাকায়। ক্রুর পদাতিক যত যুগে যুগে উদ্ধত পায়ের দাগ রেখে গেছে কোমল পলির ত্বকে, বিভিন্ন মুখের কোটি অশ্বারোহী এসে খুরে খুরে ক্ষতময় করে গেছে সহনীয়া মাটি, লালসার লালামাখা ক্রোধে বন্দুক কামান কত অসুর গর্জনে চিরেছে আকাশ পরিপাটি, বিদীর্ণ বুক নীল বর্ণ হয়ে গেছ তুমি, বাংলাভূমি নত হয়ে গেছে মুখ ক্ষোভে ও লজ্জায়।
আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি। তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল তাঁর পিঠে রক্তজবার মতো ক্ষত ছিল। তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন। জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান ঘাটুগান গাইতাম॥ বর্ষা যখন হইত গাজির গাইন আইত রঙ্গে-ঢঙ্গে গাইত আনন্দ পাইতাম বাউলা গান ঘাটুগান আনন্দের তুফান গাইয়া সারিগান নাও দৌড়াইতাম॥
শাখে শাখে চৈত্রের পল্লবে দেখেছি বিমুগ্ধ চোখে সবুজের বর্ণ সমারোহ; সে-বর্ণের কিছু আছে রহস্য জটিল কিছু আছে অন্তরের কথা। পত্রঝরা শাখা-বৃন্ত-প্রাণে কী অব্যক্ত অনুনয় ছিল, রুক্ষ শাখা ঊর্ধ্বশূন্যে কি কথা শোনালো, উচ্ছ্বসিত বেদনার প্রাণস্পন্দ নিয়ে কোথা থেকে এলো এই সবুজের শিশু, তার কিছু ইতিহাস অদৃশ্য অক্ষরে আছে লেখা।
আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি, আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি।
আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়-ফুল নয়, ওরা শহিদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।
অনেক ঘূর্ণিতে ঘুরে, পেয়ে ঢের সমুদ্রের স্বাদ, জীবনের পথে পথে অভিজ্ঞতা কুড়ায়ে প্রচুর কেঁপেছে তোমাকে দেখে জলদস্যু- দুরন্ত হার্মাদ, তোমার তরঙ্গভঙ্গে বর্ণ তার হয়েছে পাণ্ডুর! সংগ্রামী মানুষ তবু দুই তীরে চালায়ে লাঙল কঠিন শ্রমের ফল- শস্য দানা পেয়েছে প্রচুর;
আমি যাচ্ছি নাখালপাড়ায়। আমার বৃদ্ধ পিতা আমাকে পাঠাচ্ছেন তাঁর প্রথম প্রেমিকার কাছে। আমার প্যান্টের পকেটে সাদা খামে মোড়া বাবার লেখা দীর্ঘ পত্র। খুব যত্নে খামের উপর তিনি তাঁর প্রণয়িনীর নাম লিখেছেন। কে জানে চিঠিতে কি লেখা – ? তাঁর শরীরের সাম্প্রতিক অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা ? রাতে ঘুম হচ্ছেনা, রক্তে সুগার বেড়ে গেছে কষ্ট পাচ্ছেন হাঁপানিতে – এইসব হাবিজাবি। প্রেমিকার কাছে লেখা চিঠি বয়সের ভারে প্রসঙ্গ পাল্টায় অন্য রকম হয়ে যায়। সেখানে জোছনার কথা থাকে না, সাম্প্রতিক শ্বাসকষ্ট বড় হয়ে উঠে। প্রেমিকাও একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর রোগভুগের কথা পড়তে ভালবাসেন। চিঠি পড়তে পড়তে দরদে গলিত হন – আহা, বেচারা ইদানিং বড্ড কষ্ট পাচ্ছে তো …
আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও সভ্যতার সেই প্রতিশ্রুতি সেই অমোঘ অনন্য অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও। সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে পৃথিবীর যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে অরণ্য হবে আরও সবুজ নদী আরও কল্লোলিত পাখিরা নীড়ে ঘুমোবে।
"হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়, বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?" কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি- "দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি? বাতাবি নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল? দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?"
সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ বিকেলের নক্ষত্রের কাছে; সেইখানে দারুচিনি-বনানীর ফাঁকে নির্জনতা আছে। এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।