ফাগুন মাস কবিতা – হুমায়ুন আজাদ
ফাগুনটা খুব ভীষণ দস্যি মাস পাথর ঠেলে মাথা উঁচোয় ঘাস। হাড়ের মতো শক্ত ডাল ফেঁড়ে সবুজ পাতা আবার ওঠে বেড়ে। সকল দিকে বনের বিশাল গাল ঝিলিক দিয়ে প্রত্যহ হয় লাল। বাংলাদেশের মাঠে বনের তলে ফাগুন মাসে সবুজ আগুন জ্বলে।
ফাগুনটা খুব ভীষণ দস্যি মাস পাথর ঠেলে মাথা উঁচোয় ঘাস। হাড়ের মতো শক্ত ডাল ফেঁড়ে সবুজ পাতা আবার ওঠে বেড়ে। সকল দিকে বনের বিশাল গাল ঝিলিক দিয়ে প্রত্যহ হয় লাল। বাংলাদেশের মাঠে বনের তলে ফাগুন মাসে সবুজ আগুন জ্বলে।
নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল। ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিলো থরথর। মিনারটাকে দেখছি যেন দাঁড়িয়ে আছেন কেউ, পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ? দরগাতলা পার হয়ে যেই মোড় ফিরেছি বাঁয় কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিলো আয় আয়।
এই তো দ্যাখো ফুলবাগানে গোলাপ ফোটে, ফুটতে দাও। রঙিন কাটা ঘুড়ির পিছে বালক ছোটে, ছুটতে দাও। নীল আকাশের সোনালি চিল মেলছে পাখা, মেলতে দাও। জোনাক পোকা আলোর খেলা খেলছে রোজই, খেলতে দাও।
এখন তুমিই বলো নারী তোমার উদ্যান ছাড়া আমি আর কোথায় দাঁড়াবো। আমাকে দাঁড়াতে দাও বিশুদ্ধ পরিপূর্ণতায়, ব্যাকুল শুশ্রুষা দিয়ে আমাকে উদ্ধার করো নারী তুমি শৈল্পিক তাবিজ, এতোদিন নারী ও রমনীহীন ছিলাম বলেই ছিলো দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ।
ছাতা মাথায় ব্যাঙ চলেছে চিঠি বিলি করতে, টাপুস টুপুস ঝরছে দেয়া ছুটছে খেয়া ধরতে। খেয়ানায়ের মাঝি হলো চিংড়ি মাছের বাচ্চা, দু চোখ বুজে হাল ধরে সে জবর মাঝি সাচ্চা।
ঝিঙে ফুল! ঝিঙে ফুল! সবুজ পাতার দেশে ফিরোজিয়া ফিঙে-কুল— ঝিঙে ফুল। গুল্মে পর্ণে লতিকার কর্ণে ঢলঢল স্বর্ণে ঝলমল দোলো দুল— ঝিঙে ফুল ॥ পাতার দেশের পাখি বাঁধা হিয়া বোঁটাতে, গান তব শুনি সাঁঝে তব ফুটে ওঠাতে।
জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে সে জাতির নাম মানুষ জাতি; এক পৃথিবীর স্তন্যে লালিত একই রবি শশী মোদের সাথি। শীতাতপ ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালা সবাই আমরা সমান বুঝি, কচি কাঁচাগুলি ডাঁটো করে তুলি বাঁচিবার তরে সমান যুঝি।
নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?— এ ধরা কি শুধু বিষাদময়? যাতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে কেবলি কি নর জনম লয়?— বল ছিন্ন বীণে, বল উচ্চৈঃস্বরে— না, না, না, মানবের তরে আছে উচ্চ লক্ষ্য, সুখ উচ্চতর না সৃজিলা বিধি কাঁদাতে নরে।
ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো ইচ্ছে ছিলো তোমাকেই সুখের পতাকা করে শান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবো।
হঠাৎ সেদিন হাতে পেয়ে চিরকুট নিমিষে সময় হয়ে গেলো যেন লুট; পার হয়ে বহু বছরের ব্যবধান কানে ভেসে এলো হারানো দিনের গান।
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে। সার্থক জনম, মা গো, তোমায় ভালোবেসে॥ জানি নে তোর ধন রতন আছে কি না রানির মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।॥
আমি যাচ্ছি নাখালপাড়ায়। আমার বৃদ্ধ পিতা আমাকে পাঠাচ্ছেন তাঁর প্রথম প্রেমিকার কাছে। আমার প্যান্টের পকেটে সাদা খামে মোড়া বাবার লেখা দীর্ঘ পত্র। খুব যত্নে খামের উপর তিনি তাঁর প্রণয়িনীর নাম লিখেছেন। কে জানে চিঠিতে কি লেখা – ? তাঁর শরীরের সাম্প্রতিক অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা ? রাতে ঘুম হচ্ছেনা, রক্তে সুগার বেড়ে গেছে কষ্ট পাচ্ছেন হাঁপানিতে – এইসব হাবিজাবি। প্রেমিকার কাছে লেখা চিঠি বয়সের ভারে প্রসঙ্গ পাল্টায় অন্য রকম হয়ে যায়। সেখানে জোছনার কথা থাকে না, সাম্প্রতিক শ্বাসকষ্ট বড় হয়ে উঠে। প্রেমিকাও একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর রোগভুগের কথা পড়তে ভালবাসেন। চিঠি পড়তে পড়তে দরদে গলিত হন – আহা, বেচারা ইদানিং বড্ড কষ্ট পাচ্ছে তো …
হাতের তালুতে ভাগ্য দেখতে যেয়ো না গালিব ভাগ্য তারও আছে যার হাত নেই হাতি কি লাকিরুপে মাত যা আয়ে গালিব কিসমাত উসকি ভি হোতি হ্যায় জিসকা হাত নেহি হোতা
শোন মিলি। দুঃখ তার বিষমাখা তীরে তোকে বিঁধে বারংবার। তবুও নিশ্চিত জানি,একদিন হবে তোর সোনার সংসার ।। উঠোনে পড়বে এসে একফালি রোদ তার পাশে শিশু গুটিকয় তাহাদের ধুলোমাখা হাতে – ধরা দেবে পৃথিবীর সকল বিস্ময়।
আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও। বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি, একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি। একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে, তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে। পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়, সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।