You are currently viewing স্বামী প্রণবানন্দের বাণী : স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের ৩০ টি বিখ্যাত উক্তি

স্বামী প্রণবানন্দের বাণী : স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের ৩০ টি বিখ্যাত উক্তি

স্বামী প্রণবানন্দ ছিলেন (২৯ জানুয়ারি,১৮৯৬ – ৮ জানুয়ারি ১৯৪১) মাদারিপুর জেলার বাজিতপুর গ্রামে বিষ্ণুচরণ ভূঞা ও মাতা সারদাদেবীর ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন। বাল্য নাম ছিল বিনোদ। গ্রামটি ছিল সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা। জমিদারের অত্যাচার থেকে প্রজাদের বাঁচাতে গিয়ে বিনোদনের পিতা বিষ্ণুচরণ ভুঁইয়া মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়েন। বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য গৃহদেবতা নীলরুদ্রের শরণাপন্ন হন তিনি। ভক্তের কাতর প্রার্থনায় দেবাদিদেব মহাদেব শিব প্রসন্ন হয়ে তাকে দর্শন দান করেন ও বলেন “ভয় নেই আমি তোমার পুত্র রূপে জন্মগ্রহণ করবো। আমার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তোমাদের বিপদের মেঘ কেটে যাবে।”

গোরক্ষপুরের মহাযোগী বাবা গম্ভীরনাথজীর নিকট ১৯১৩ সালে ১৭ বৎসর বয়সে তিনি দীক্ষালাভ করেন এবং ১৯১৬ সালে মাত্র ২০ বৎসর বয়সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। ১৯২৪ সালে প্রয়াগে অর্দ্ধকুম্ভমেলায় স্বামী গোবিন্দানন্দ গিরির নিকট আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস গ্রহণ পূর্বক স্বামী প্রণবানন্দ নামে পরিচিত হন। ১৯৪১ সালে ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪৫ বৎসর বয়সে তিনি দেহ ত্যাগ করেন।

এ-দেশ ভগবানকে লইয়া জীবন-জনম কাটাইয়াছে ও কাটাইতে চায়। জড়বাদকেই যে দেশ চরমবাদ বলিয়া ধরিয়াছে – এ-দেশ সে দেশ নয় । এ-দেশ চায় – নীতি, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা ।

এদেশের আলস্য, ঔদাস্য, নিদ্রা, তন্দ্রা ও জড়তাকে দূর করিয়া দেশের প্রাণে প্রবল কর্মশক্তি জাগাইয়া দিতে হইবে; সমগ্র দেশে এমন ধর্মের প্রভাব বিস্তার করিতে হইবে যাহার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হইয়া, যাহার শক্তিতে শক্তিশালী হইয়া এদেশ আবার জাগিয়া উঠিবে।

তোমরা সনাতন আদর্শে গঠিত হইয়া আর্য-ঋষিদের আসনে উপবেশন করিয়া এই অধঃপতিত দেশ ও জাতিকে নীতি ও ধর্মের পথে পরিচালনা করিবে । ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তিগুলিকে সমবেত ও সম্মিলিত করিয়া বিরাট সঙ্ঘ-শক্তি সংগঠন কর । এই দুর্বল জাতিকে সবল ও নিস্তেজ জাতিকে সতেজ করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হও।

বর্তমানে ভারতবর্ষে যে আবহাওয়া চলিতেছে তাহার পরিবর্তনের জন্য প্রথমতঃ লক্ষ লক্ষ ত্যাগী পুরুষের প্রয়োজন। এই ত্যাগী পুরুষদের প্রভাবেই দেশের ভাবধারা বদলাইয়া যাইবে। তাহার পরে সেই পরিবর্তিত আবহাওয়া ও ভাবধারার মধ্যে নূতন জাতি গড়িয়া উঠিবে।


বাংলার বালক ও যুবকদের ভাব দেখিয়া যাহাতে আশার সঞ্চার হয় তাহা করিতে হইবে।

বর্তমান ছেলেদের ভিতর যে নৈতিক অধঃপতন দেখা দিয়াছে তাহা যদি আর কিছুকাল চলে, তবে জাতির মেরুদণ্ড ভাঙ্গিয়া যাইবে, জীবনীশক্তি লোপ পাইবে, উন্নতি অভ্যুদয়ের আশা চিরতরে নির্মূল হইবে। এই ধ্বংসোন্মুখ ছাত্র-সমাজকে নৈতিক অধঃপতনের কবল হইতে রক্ষা করিয়া জাতির প্রাণশক্তি অটুট রাখাই এখন প্রধান কাজ। ইহাই জাতি-গঠনের গোড়ার কথা । দেশে যদি প্রকৃত মানুষ তৈরী হয়, তবে সমস্তই সম্ভব হইবে । তাহা না হইলে সব কিছু হাওয়ায় মিলাইয়া যাইবে । মানুষের মত মানুষ – একটি খাঁটি মানুষ তৈরী হইলে সমগ্র জাতি তাহার শক্তিতে শক্তিমান হইয়া একটা নূতন অভ্যুত্থান – একটা নূতন যুগের সৃষ্টি করিতে পারে । এই মানুষ তৈরীর জন্য চাই – জাতির প্রাণশক্তিস্বরূপ ছাত্র-সমাজে এক প্রবল শক্তিশালী নৈতিক আন্দোলন। এই আন্দোলন হইবে, তোমাদের মত দুই চারিটি ছেলে যাহারা জীবন-গঠন সাধনা করিতেছে, তাহাদের দ্বারা ।

সংযমই মানুষকে সুস্থ সবল রাখে, সংযমই মানুষকে দীর্ঘজীবী করে । সুতরাং সর্বপ্রযত্নে সংযম অভ্যাস করিতে হইবে।

ছাত্র-জীবনে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য চরিত্রগঠন। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক চরিত্র গঠন চাই। তাহা না হইলে কোন কিছুই হইবে না।

জীবনের ভিত্তি খুব পাকা হওয়া চাই। ত্যাগ সংযম, সত্য ক্ষমা ব্রহ্মচর্যই জীবনের মূল ভিত্তি। এই ভিত্তির উপর জীবন সুপ্রতিষ্ঠিত হইলেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যাইবে।
স্বামী প্রণবানন্দ

১০

খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষা চাই। উচ্চাকাঙ্ক্ষাই মানুষকে সমস্ত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করিয়া উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে সাহায্য করে।

১১

প্রতিদিন কিছু সময় প্রার্থনা ও ভগবানের নাম জপ করিবে। নাম করিলে হৃদয়ের সমস্ত অন্ধকার দূর হইবে, কুবাসনা কুপ্রবৃত্তি নষ্ট হইবে । ভগবানের নামই অন্তরের সমস্ত পাপ তাপ, জ্বালা যন্ত্রণা দূর করিয়া মহাশান্তি, শক্তি ও আনন্দ দান করে – ভিতরে পূর্ণ পবিত্রতা প্রতিষ্ঠিত করে।

১২

সমস্ত সময়ই কোন না কোন কার্যে নিযুক্ত থাকিবে। কখনও বিনা কাজে বসিয়া থাকিতে নাই। মন যেন কখনও খালি না থাকে।

১৩

প্রয়োজন ব্যতীত কোন দিকে তাকাইবে না। যে দৃশ্যে দেখিলে মনে কুচিন্তা, কুভাবনা ও কুপ্রবৃত্তি জাগ্রত হয় তা দেখিবে না।

১৪

দৈনিক অন্তত দশ ঘন্টা পড়িবে। ছাত্রজীবনের প্রধান কর্তব্য অধ্যয়ন। তাহাতে অবহেলা মহাপাপ।

১৫

যাহার সহিত মিশিলে বা যাহাকে স্পর্শ করিলে সদ্ভাব সৎপ্রবৃত্তি নষ্ট হয় ও চিত্তবিকার জন্মে তাহার সহিত মিশিবে না ও তাহার অঙ্গাদি স্পর্শ করিবে না।

১৬

অপ্রয়োজনীয় কথা বলিবে না, তাহাতে মনের শক্তি হ্রাস পায়।

১৭

চেষ্টা-যত্ন উদ্যমে সমস্তই হয়। যাহার চেষ্টা-যত্ন উদ্যম আছে তাহার সমস্তই আছে, সে সব কিছুই করিতে পারে, আর যাহার তাহা নাই তাহার কিছুই নাই, সে এ জগতে কিছুই করিতে পারে না।

১৮

যাহা সত্য বলিয়া জানিব তাহার জন্য জীবন পণ করিব, আর যাহা মিথ্যা বলিয়া বুঝিব তাহা তৎক্ষণাৎ পরিত্যাগ করিব – এইরূপ দৃঢ় মনোবল প্রয়োজন। তাহা হইলে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়।

১৯

তোমরা কুচিন্তা করিও না, কুভাবনা ভাবিও না, কুকথা শুনিও না, কুদৃশ্য দেখিও না, কু-আলোচনা করিও না, কুপ্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিও না, কুসঙ্গে মিশিও না, কুগ্রন্থ পড়িও না। তাহা হইলে মনোবল অক্ষুণ্ণ থাকিবে এবং পড়াশুনার উন্নতি হইবে।

২০

কুচিন্তা কুভাবনা প্রভৃতির দ্বারা মনোবল নষ্ট হয় এবং মানুষ ক্রমশ অমানুষে পরিণত হয় – এই কথা সর্বদা মনে রাখিয়া চলিবে।

২১

নিয়মিত ও পরিমিত আহার শরীরকে রক্ষা করে । আর অনিয়মিত ও অপরিমিত আহার শরীরকে ধ্বংস করে।

২২

অতিরিক্ত আহার ও অতিরিক্ত নিদ্রা বীর্য নষ্ট করিয়া দেয় । সুতরাং এবিষয়ে সাবধান হইবে।

২৩

নিজের পড়িবার ঘরের দেওয়ালে সাদা কাগজের উপর সবুজ কাগজের ছোট গোলক (ক্ষুদ্র গোল করিয়া কাটা কাগজ) আঠা দিয়া লাগাইয়া রাখিবে এবং প্রত্যহ প্রাতঃকালে পড়া আরম্ভ করিবার পূর্বে পদ্মাসন করিয়া বসিয়া নিস্পন্দভাবে তাহার দিকে তাকাইয়া থাকিবে। ইহাতে দৃষ্টিশক্তি ও মনের একাগ্রতা বৃদ্ধি পাইবে।

২৪

চরিত্রবলই মানুষের প্রকৃত বল। চরিত্রবলের দ্বারাই মানুষ জীবনের সংগ্রামক্ষেত্রে বিজয়ী বীরের মত অচল অটল হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতে পারে। আর চরিত্রবলের অভাব ঘটিলেই মানুষের অন্তরে ঘুণ ধরে মন দুর্বল হয়, সামান্য আঘাতে ভাঙ্গিয়া পড়ে। সুতরাং সাবধান, কোনক্রমেই যেন চরিত্রবল নষ্ট না হয়।

২৫

নিয়মিত ব্যায়াম করিবে ও রীতিমত ডায়েরি লিখিবে।

২৬

সর্বদা সমস্ত অবস্থায় পর্বতের ন্যায় অটল থাকিবে, কোন কিছুতেই বিচলিত হইবে না।

২৭

প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নবজীবনের নূতন সঙ্কল্প লইয়া আরম্ভ করিবে; সমস্ত দিন এমনিভাবে চলিবে যাহাতে একটা পরিবর্তন, একটু উন্নতি অনুভব করিতে পার।

২৮

আদর্শহীন জীবন মৃত্যুরই নামান্তর। খাঁটি মানুষ যে, সে আদর্শের জন্য জীবন বিসর্জন দেয়; কিন্তু জীবনের জন্য আদর্শ বিসর্জন দেয় না । জীবনের আদর্শই যদি নষ্ট হয় তবে আর বাঁচিয়া থাকিয়া লাভ কি ? ব্যর্থ জীবনের বিড়ম্বনা মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাকর।

২৯

বিলাসিতাকে বিষের মত পরিত্যাগ করিবে । বিলাসিতার ভিতর দিয়াই মানুষের ভিতরে নানা প্রকার উচ্ছৃঙ্খলতা প্রবেশ করে, চিত্ত তরল ও চঞ্চল হয় । দুষ্ট কীটের মত ইহা জীবনকে একেবারে অন্তঃসারহীন করিয়া ফেলে। সুতরাং সাবধান।

৩০

সংগ্রামকে নির্ভীকভাবে বরণ করিয়া লওয়াই বীরের ধর্ম।

Leave a Reply