সেই ছেলেটি
— মামুনুর রশীদ
১ম দৃশ্য
(গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছে সোমেন, সাবু ও আরজু। সবাই গান গাইতে গাইতে স্কুলে যাচ্ছে। বেশ তাড়া তাদের। একসময় হঠাৎ থেমে যায় আরজু। ওরা আরজুকে ফেলেই চলে যায়। আরজুর ব্যথা পায়ে। সাবু ফিরে আসে।)
সাবু: কী হলো আবার?
আরজু: আমি যে আর হাঁটতে পারছি না।
সাবু: রোজ রোজ তোর জন্য আমি স্যারের বকুনি খেতে পারব না।
আরজু: ঠিক আছে তোরা যা, আমি একাই এক্ষুনি যাব।
সাবু: থাক তাহলে।
(চলে যায় সাবু। আরজু বসে পড়ে। এ সময়ই ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক আইসক্রিমওয়ালা।)
আইসক্রিমওয়ালা: আইসক্রিম, আইসক্রিম চাই আইসক্রিম। কী হলো আরজু মিয়া, তুমি এখানে বসে কী করছ?
আরজু: কিছু না।
আইসক্রিমওয়ালা: স্কুলে যাবে না?
আরজু: না।
আইসক্রিমওয়ালা: স্কুলে ফাঁকি দেওয়া কিন্তু খুব খারাপ, আমিও খুব স্কুল ফাঁকি দিতাম। আমার অবস্থা দ্যাখো। যদি লেখাপড়াটা করতাম তাহলে কি আর আইসক্রিম ফেরি করতে হতো? যাও স্কুলে যাও। চাই আইসক্রিম, আইসক্রিম।
আরজু: ভাই শোনো- তুমি কোন দিকে যাচ্ছ?
আইসক্রিমওয়ালা: আমি তো যাব ঐ বাজারের দিকে।
আরজু: আজ স্কুলের দিকে যাবে না? আইসক্রিম খাব, টিফিন পিরিয়ডের সময়।
আইসক্রিমওয়ালা: ক্লাস যখন চলে তখন তো আর আইসক্রিম বিক্রি হয় না। আমার বাজারের সময় চলে যায়। চাই আইসক্রিম।
(আইসক্রিমওয়ালা চলে যায়। হাওয়াই মিঠাইওয়ালার প্রবেশ।)
আরজু: ভাই শোনো।
হাওয়াই মিঠাইওয়ালা: শুধু শুধু ডাকছ কেন? এভাবে সময় নষ্ট হলে আমার হাওয়াই মিঠাই যে শূন্যে মিলিয়ে যাবে।
আরজু: তোমার হাওয়াই মিঠাই কি মেঘের মতো যে, মেঘ জমছে আর শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।
হাওয়াই মিঠাওয়ালা: হ্যাঁ, মেঘের চাইতেও অনেক হালকা তাই তো মিলিয়ে যায়। যাই চাই হাওয়াই মিঠাই (চলে যায়)।
আরজু: এখন আমি কী করব? বাড়ি গেলে বাবা বলবে স্কুলে ফাঁকি দেওয়ার মতলব — স্কুলে গেলে স্যার বলবে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি তো দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। এখন কী হবে?
২য় দৃশ্য
(টিফিনের ঘণ্টা বাজে। সোমেন, সাবু ও আরও ছেলেমেয়ে টিফিন পিরিয়ডে বেরিয়ে আসছে। তারা খেলছে। এ সময়ে আসেন লতিফ স্যার।)
লতিফ স্যার: এই সাবু, এদিকে শোনো- আচ্ছা আরজুকে দেখছি না যে?
সাবু: স্যার মাঝপথে এসে আরজু বলল তোরা যা। এরকম মাঝে মাঝেই করে আরজু।
লতিফ স্যার: কিন্তু কেন করে?
সাবু: এমনিই।
লতিফ স্যার: এমনিই মানে? ইচ্ছে করে? না কি কোনো সমস্যা আছে ওর?
সাবু: জানি না স্যার।
লতিফ স্যার: আচ্ছা। এই যে সোমেন, এদিকে শোনো, তোমার কী মনে হয় আরজু কি ইচ্ছে করেই স্কুল কামাই করছে?
সোমেন: স্যার, ওর যে কী হয়? হঠাৎ করে বলে আমি আর যেতে পারছি না, তোরা দাঁড়া। তখন ওয়ার্নিংবেল বেজে গেছে। আর কি দাঁড়াতে পারি? তাই তো চলে আসি, সেটাই ভালো না স্যার?
লতিফ স্যার: কোথায় যেন একটা সমস্যা মনে হচ্ছে।
মিঠু: স্যার ঐ ছেলেটার সাথে আমারও দেখা হয়েছে।
লতিফ স্যার: কোথায়?
মিঠু: ঐ যে পলাশতলীর আমবাগানের ওখানে বসে আছে। আমার সাথে নানান কথা।
লতিফ স্যার: নানা কথা? তাহলে স্কুলে এলো না কেন?
মিঠু: একসময় বলল তুমি কি স্কুলের দিকে যাবে? আমি বললাম না যাব। তারপর টিফিন পিরিয়ডের দিকে স্কুলের দিকে যাব।
লতিফ স্যার: তাহলে তো খুবই চিন্তার কথা। আচ্ছা ঐ আমবাগানে কি এখনও আছে?
সোমেন: মনে হয় এতক্ষণে বাড়ি চলে গেছে।
লতিফ স্যার: তোমরা চলো তো—
সাবু: স্যার (ওদের চোখে মুখে অনিচ্ছা। হাওয়াই মিঠাইওয়ালা হেঁকে চলছে-হাওয়াই মিঠাই। লতিফ স্যার ওদের দুইজনকে নিয়েই রওয়ানা দেন।)
৩য় দৃশ্য
(আমবাগান। অসহায় আরজু বসে আছে। একা সে উঠে দাঁড়ায়। একটা পাখি ডাকছে। তাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করছে সে।)
আরজু: পাখি, একটু নিচে নাম না। তোমার সাথে কথা কই। আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে? সাবু, সোমেন ওরা কেউ নিয়ে গেল না। তুমি নিয়ে যাও না! তোমার ডানায় ভর করে চলে যাব। কী হলো? নেমে গেলে কেন? মেঘ আমায় নিয়ে যাও না। তোমার কোলে বসে চলে যাব স্কুলে। কী বলছ? ভিজে যাব? ভিজলাম। আবার শুকিয়ে যাব- তবুও তো স্যার বুঝবেন, ছোটো পাখি চন্দনা, এই যে শালিক আমাকে দেখতে পাচ্ছ না? আমি একলা বসে আছি। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমার সাথে কথা বল না চন্দনা আমায় নিল না, মেঘ আমায় নিল না — শালিক আমার সাথে কথা বলে না।
আরজু কাঁদতে থাকে। হঠাৎ উপস্থিত হয় লতিফ স্যার।)
লতিফ স্যার: আরজু, তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কী হয়েছে? তুমি স্কুলে যাও নি কেন?
সোমেন: কাঁদিস কেন? স্যারকে বল না। (আরজু কাঁদছেই)
লতিফ স্যার: কোনো ভয় নেই, বল।
আরজু: স্যার, আমি বেশি দূর হাঁটতে পারি না। পা দুটো অবশ হয়ে আসে।
লতিফ স্যার: তোমার বাবা-মাকে বল নি কেন?
আরজু: বলেছি- বাবা বলেন হাঁটাহাঁটি করলেই ঠিক হয়ে যাবে।
লতিফ স্যার: তোমার পা দুটো দেখি এ তো রোগ, তোমার পা চিকন হয়ে গেছে।
আরজু: মা জানে, সেই ছোটোবেলায় কী যেন অসুখ হয়েছিল সেই থেকেই পাটা চিকন— মা বোঝে কিন্তু কাঁদে শুধু।
লতিফ স্যার: তোমরা খেয়াল কর নি?
সোমেন: না স্যার।
লতিফ স্যার: তোমাদের বন্ধু না?
সোমেন: জ্বী স্যার
লতিফ স্যার: তোমার যদি এরকম হতো?
সোমেন: আমরা বুঝতে পারিনি স্যার। এরকম বুঝলে আমরা দুজনে ধরে এইভাবে নিয়ে যেতাম। (দুজনেই কাঁধে হাত দিয়ে ওকে তুলে ফেলে।)
লতিফ স্যার: বলো স্কুলে যাবে? না কি বাড়ি যাবে?
আরজু: স্কুলে স্যার। (ওদের কাঁধে হাত তুলে আরজু স্কুলে যায়।)
লতিফ স্যার: চলো। দেখি তোমার চিকিৎসার জন্য আমরা কী করতে পারি।
