ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস

ভালাবাসা দিবস নামটা শুনলেই চকলেট, গোলাপ ফুল দিয়ে নিজের প্রেয়সী কে প্রপোজ করা কিংবা রোমান্টিক ডিনারের চিন্তাভাবনা মনকে জাগিয়ে তোলে।

কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, বিশ্বজুড়ে কেনো এই ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন করা হয়?
এর পুরো ইতিহাস সম্পর্কে হয়তো অনেকের জানা নেই। আবার অনেকেরই হয়তো মনে প্রশ্ন জাগে, ভ্যালেন্টাইন ডের জন্ম বা উৎপত্তি কখন, কবে আর কোথায় হয়েছিল?

পাঠক, চলুন ভালোবাসা দিবসের অদ্যোপান্ত জেনে নিই।

ইতিহাস

বর্তমানে ভালোবাসা দিবসে যে রোমান্টিকতা দেখা যায় এর ইতিহাস কিন্তু আদৌও রোমান্টিক নয়।

কিছু পণ্ডিত বিশ্বাস করেন যে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ এর উৎস পাওয়া যায় প্রাচীন রোমান উৎসব লুপারক্যালিয়াতে, যা ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হতো।

রোমানরা খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আগে প্যাগান (পৌত্তলিক) ধর্মের অনুসারী ছিলেন। প্যাগান ধর্মের লোকজন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে পূর্বপুরুষদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ফেব্রুয়ালিয়া পূজা পালন করতেন। এই ফেব্রুয়ালিয়া অনুষ্ঠানের নামানুসারে পরবর্তীতে ইংরেজি মাসের নামকরণ করা হয় ফেব্রুয়ারি। তখন ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত এই পূজা হতো।পূজার উদ্দেশ্য ছিল দেবতার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে পুণ্যতা, উর্বরতা ও সমৃদ্ধি লাভ করা। অনুষ্ঠানের মাঝের দিনটি ছিল খুবই আকর্ষণীয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি দেবীরাণী জুনোর সম্মানে পবিত্রতার জন্য কুকুর আর উর্বরতার জন্য ছাগল উৎসর্গ করা হতো। উৎসর্গীকৃত কুকুর ও ছাগলের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যুবকেরা চামড়ার তৈরি সামান্য পোশাক পরতো। তারপর চামড়ার বেত দিয়ে দেবীর নামে তরুণীদের শরীরে আঘাত করতো।

প্রাচীন রোমের লুপারক্যালি উৎসব Photo credit: Fantastic Frugal

সে সময়ের মানুষ বিশ্বাস করতো, এই আঘাতের কারণে দেবী ওই তরুণীদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেবেন। দিনটির আরো একটি বিশেষত্ব হলো, এ দিনেই পরবর্তী এক বছর আনন্দ দেওয়ার জন্য দেবীর ইচ্ছায় লটারির মাধ্যমে তরুণরা তাদের তরুণী সঙ্গীকে বেছে নিতেন। প্রথানুযায়ী বড় একটি বাক্সে তরুণীদের নাম লিখে রাখা হতো। সেখান থেকে তরুণরা একেকটি নাম তুলে পরবর্তী বছর লটারি হওয়া পর্যন্ত নির্বাচিত যুগল একসঙ্গে থাকার সুযোগ পেতেন।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন

২৬৯ সালে ঘটে যায় একটি বিরল ঘটনা। সে সময় রোমান সম্রাট ছিলেন ক্লাডিউয়াস। খ্রিস্টান ধর্মযাজক, সমাজসেবক ও চিকিৎসক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামের এক যুবক ধর্ম প্রচারকালে রোমান সম্রাট ক্লাডিউয়াস এর নানা আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে গ্রেপ্তার হন। এই আদেশের অন্যতম একটি ছিল, রোমান সম্রাট ক্লাডিউয়াস কর্তৃক যুবক সেনাদের বিয়ে করা নিষেধ করে দেওয়া। সেসময় রোমান সম্রাট সৈনিকদের বিয়ে নিষিদ্ধ করেছিলেন। কারন সৈনিকরা নিজেদের প্রেয়সীদের ছেড়ে যুদ্ধে যেতে চাইতো না।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন সম্রাটের এই আদেশের বিপরীতে গিয়ে যুবক সেনাদের বিয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন ও গোপনে বিয়ে দিয়ে দিতেন। এছাড়া জনগণকে ধর্মদ্রোহী করা, সম্রাটের বিপক্ষের যুদ্ধাহত খ্রিস্টান সৈন্যদের চিকিৎসা করা এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের জন্য সম্রাটের রোষানলে পড়ে গ্রেপ্তার হন বিদ্রোহী যুবক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন Photo credit: Taylor Frint/The Manual

ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে পাঠানোর পর জনগণের কাছে তিনি আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এই সাহসী এবং জনপ্রিয় যুবককে দেখার জন্য প্রতিদিন অগণিত মানুষ কারাগারে যেতেন। এর মধ্যে এক কারারক্ষীর অন্ধ মেয়ে ‘জুলিয়া’ ও ছিলেন। ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে তিনি প্রায়ই কারাগারে দেখা করতেন এবং দীর্ঘসময় তারা এক সঙ্গে কাটাতেন।

আরো পড়ুন   ঢাকা শহরের হারিয়ে যাওয়া পেশা

এর মধ্যে ঘটে যায় আশ্চর্যজনক এক ঘটনা। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন তার আধ্যাত্মিক চিকিৎসার মাধ্যমে অন্ধ জুলিয়াকে সুস্থ করে তোলেন এবং তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন। এক সময় ভ্যালেন্টাইন ও জুলিয়া একে অন্যের প্রতি গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েন।

এই সংবাদ শোনার পর সম্রাট ক্লাডিউয়াস আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ২৭০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, দিনের কোনো এক সময়ে, হাজারো মানুষের সামনে স্টিভ ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। নির্বিকার, সাহসী যুবক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ফাঁসিকাষ্ঠে যাওয়ার আগে, তার ভালোবাসার মানুষ জুলিয়াকে একটি চিঠি লিখে যান। যে চিঠির শেষে লেখা ছিল ‘তোমার ভ্যালেন্টাইনের পক্ষ থেকে’।

এরপর কেটে যায় ২২৬ বছর। এক সময় লিওপারসালিয়া বা ফেব্রুয়ালিয়া পুজার নাম ও পদ্ধতি পরিবর্তন করে নিজ ধর্মের যাজক স্টিভ ভ্যালেন্টাইনের নামে অনুষ্ঠানের নামকরণ করেন তারা। সেই সময় মানে ৪৯৬ সাল থেকেই ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ এর সূচনা। কিন্তু মধ্যযুগে এসে সমস্ত ইউরোপে ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ ছিল।

ভ্যালেন্টাইন ডে রোমান্টিকতার ছোঁয়া পেলো যেভাবে

মনে করা হয় রোমান্টিকতার শুরু হয়েছিলে ইংরেজি পদ্যের জনক চসারের হাত ধরে। চসার তার ‘Parlement of Foules’ কবিতায় লিখেছিলেন,
“For this was on St. Valentine’s Day, when every bird cometh there to choose his mate.”
চসারের সময়, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে পাখিরা জুটি বাঁধতে শুরু করে এবং সঙ্গম শুরু করে এবং আর ইউরোপীয় অভিজাতরা বছরের এই সময়ে ভালোবাসার মানুষের কাছে প্রেমের পত্র পাঠাতে শুরু করে।

চসার Credit: world history encyclopedia

শোনা যায়, ১৪১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লন্ডন টাওয়ারে বন্দী থাকাকালীন সময়ে ফরাসী ডিউক অফ অরলিন্স তার স্ত্রীকে একটি মিষ্টি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তিনি তার স্ত্রী কে বলেছিলেন “আমায় তুমি খুব ভদ্র ভ্যালেন্টাইন” বলে ডেকো।

সময়ের সাথে সাথে, সাহিত্যে রোমান্টিক বিষয়বস্তুগুলো আরও বেশি যুক্ত হতে থাকে। এমনকি ওফেলিয়া নিজেকে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের হ্যামলেটের হ্যামলেটের ভ্যালেন্টাইন বলে অভিহিত করে বলেছেনঃ-
“To-morrow is Saint Valentine’s day, All in the morning betime, And I a maid at your window, To be your Valentine.”

Credit : Fandom

১৮ শতকের শেষদিকে ভেলেন্টাইন ডে তে হাতে লেখা চিঠির প্রচলন শুরু হয়।
১৮৪০ সালে ডাকটিকিট আবিষ্কৃত হওয়ার পর, যুক্তরাজ্যে ভ্যালেন্টাইন্স ডে কার্ডের বিস্ফোরণ ঘটে। প্রায় অর্ধ মিলিয়ন কার্ড এটির উদ্ভাবনের পরের বছর পাঠানো হয়েছিল, উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করার জন্য কারখানা স্থাপন করা হয়েছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, শিল্পায়িত ভ্যালেন্টাইন্স ডে কার্ড ১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছিল। একজন মহিলা, এস্টার হাউল্যান্ড, ম্যাসাচুসেটসে তার বাবার স্টেশনারি দোকানে বিক্রি করার জন্য ইংরেজি কার্ড এবং আমদানিকৃত কাগজের লেস এবং অন্যান্য সজ্জা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
শিল্প বিপ্লব জিনিসগুলিকে ব্যাপকভাবে গতিশীল করতে সাহায্য করেছিল এবং শীঘ্রই সমস্ত ধরণের কার্ডগুলি ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হয়েছিল।

আজ, ভ্যালেন্টাইন্স ডে হল ক্রিসমাসের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্ড পাঠানোর দিনে দ্বিতীয় বৃহত্তম! শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এই দিনের জন্য প্রায় ২০০ মিলিয়ন কার্ডের ব্যবহার হয়!

আরো পড়ুন   অ্যালকোহলীয় পানীয়ের ইতিহাস: প্রাচীন যুগের ৯ টি অদ্ভুত পানীয়

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভালোবাসা দিবস

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের, তাদের নিজস্ব পছন্দের ঐতিহ্য রয়েছে।

আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনীয়রা ১৪ ফেব্রুয়ারি তে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ উদযাপন করে না! পরিবর্তে, জুলাই মাসে ‘Week of sweetness’ নামে একটি সপ্তাহ থাকে। এই সময়ে, প্রেমিকরা চকলেট এবং অন্যান্য মিষ্টির জন্য চুম্বন বিনিময় করে।

সাউথ কোরিয়া

সাউথ কোরিয়ার দম্পতিরা প্রতি মাসের ১৪ তারিখে ‘Love Day’ বা প্রেমের দিবস উৎযাপন করে।
শুধু ফেব্রুয়ারিতে নয়! মে মাসের ১৪ তারিখ ‘রোজ ডে’ জুনের ১৪ তারিখ ‘কিস ডে’ এবং ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ ‘হাগ ডে’ পালিত হয়।”

এমনকি এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ কে ‘ব্ল্যাক ডে’ হিসেবে পালন করা হয়। এইদিন অবিবাহিত লোকেরা কালো রঙের নুডলস খেয়ে নিজেদের সান্ত্বনা দেয়।

ফিলিপাইনস

ফিলিপাইনে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে ‘গণ বিবাহের’ জন্য একটি জনপ্রিয় সময়। শত শত, এমনকি হাজার হাজার, একত্রে গাঁট বেঁধে জড়ো হয়। এই বিশাল ইভেন্টটি প্রায়ই জনসেবা হিসাবে সরকার দ্বারা স্পনসর করা হয়।

ঘানা

১৪ ফেব্রুয়ারি, ঘানায় “জাতীয় চকলেট দিবস” উদযাপন করে। মিষ্টি ছুটির দিনটি প্রথম পালিত হয়েছিল ২০০৭ সালে। যখন সরকার দেশের পর্যটন বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। এই বিশেষ দিনে, রেস্তোরাঁগুলিতে চকোলেট-থিমযুক্ত মেনুর ব্যবহার হয়। সাথে অনেক লাইভ পারফরম্যান্স এবং সঙ্গীত ইভেন্টও ও আয়োজন করা হয়।


রোমানিয়া

রোমানিয়ানরা ২৪ ফেব্রুয়ারি কে প্রেম এবং বসন্তের শুরুর দিন হিসেবে উৎযাপন করে। এদিনে অনেক দম্পতির বাগদান সম্পন্ন হয়। যুবক-যুবতীরা রঙিন ফুল তুলতে বনে যায়, অন্য দম্পতিরা সৌভাগ্যের চিহ্ন হিসাবে তুষার দিয়ে তাদের মুখ ধুয়ে নেয়।

জাপান

পশ্চিমা দেশগুলোতে মূলত পুরুষরাই নারীদের জন্য বেশি গিফট চকলেট কিংবা ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন করে থাকে। তবে জাপানের ব্যাপারটায় একটু ভিন্নধর্মী ঐতিহ্য রয়েছে।
এই দিন জাপানি মহিলারাই তাদের পুরুষ সঙ্গীদের জন্য উপহার এবং চকলেট কিনে থাকেন। এই দিনটি সেখানে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ এর পরিবর্তে ‘হোয়াইট ডে’ বলা হয়।

স্লোভেনিয়া

স্লোভেনিয়ায়, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন বসন্তের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ১৪ ফেব্রুয়ারীর এই সময়টায় গাছপালা নতুন করে তাদের লতাপাতা ও মুকুল গজাতে শুরু করে। তুষারে দীর্ঘদিন চাষবাস বন্ধ থাকায়, এইদিনেই চাষবাষের প্রথম দিন হিসেবে পালন করে।

আরেকটি জনপ্রিয় বিশ্বাস হল এই দিনে পাখিরা একে অপরকে ‘প্রেম প্রস্তাব’ করে। এই কিচিরমিচির উপলক্ষের সাক্ষী হওয়ার জন্য, আপনাকে অবশ্যই খালি পায়ে ক্ষেতের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হবে। শীতকালে তখনো ক্ষেতে তুষার থাকে যা মানুষদের পা প্রায়শই হিমায়িত হয়ে যায়।

Featured image Source: Saint Valentine baptizing St Lucilla/Wikimedia Commons; Saint Valentine kneeling/Wikimedia Commons

Leave a Comment